খালাসের রায় হওয়ার পরও কারাবন্দী হিসেবে দীর্ঘ আট বছর সময় পার করেছেন ইব্রাহিম আলী শেখ। এই দীর্ঘ সময় বিনা অপরাধে কারাগারে কাটানোর ঘটনায় তাকে পাঁচ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। সোমবার বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি শেখ তাহসিন আলীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রুল প্রদান করেন।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলার বাসিন্দা ইব্রাহিম আলী শেখ পেশায় একজন নৈশপ্রহরী ছিলেন। ২০০৩ সালে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে এবং পরবর্তীতে হত্যা ও ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়। মামলার বিচারে দায়রা আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড এবং অপর একটি মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০১৭ সালের ২০ জুলাই হত্যা মামলা ও ১৯ জুলাই ফৌজদারি অপরাধের মামলা থেকে তাকে বেকসুর খালাস দেন হাইকোর্ট। পর্যাপ্ত সাক্ষ্য ও প্রমাণের অভাবে আদালত এই রায় প্রদান করেন। তিনি বলেন, ২০০৩ সালে রাতে পাহারা শেষে সকালে ঘরে ফেরার পথে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে।
তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে, খালাসের এই আদেশের কপি কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ হয়। প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতায় সেই আদেশ কারা কর্তৃপক্ষের হাতে পৌঁছায় ২০২৫ সালে। ফলে খালাস পাওয়ার পরও তিনি ২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কারাবন্দী ছিলেন। কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তার জীবনযাত্রা চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে; দীর্ঘ কারাবাসের সময় তার স্ত্রীও তাকে ছেড়ে চলে যান। শারীরিকভাবে অসুস্থ ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়া ইব্রাহিম আলী শেখের জীবন পুনরুদ্ধারের জন্য এই ক্ষতিপূরণের দাবি জানানো হয়েছে। এতে ইব্রাহিম শেখের মৌলিক অধিকার ও জীবনের ক্ষতি হয়েছে।
গত জুলাই মাসে গণমাধ্যমে ‘জেল থেকে মুক্তি পাইছি জীবনডা ফেরত পাই নাই’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি আলোচনায় আসে। বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব আইনজীবী গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক সংগঠনটির পক্ষে গত সপ্তাহে এই রিট আবেদনটি করেন। আদালতে রিটকারী পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী হাসান শহীদ কামরুজ্জামান। তিনি জানান, খালাসের আদেশ পৌঁছাতে বিলম্ব হওয়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও গাফিলতির ফসল। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জসীম সরকার ও মোহাম্মদ ইমাম হোসেন তারেক। অসচ্ছলতার কারণে তিনি আইনজীবী নিয়োগ করতে পারেননি।
রিট আবেদনে ইব্রাহিম আলী শেখের জন্য পাঁচ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদানের পাশাপাশি তার পুনর্বাসন, যথাযথ চিকিৎসা ও বাসস্থান নিশ্চিত করার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। এছাড়া খালাসের আদেশ বিলম্বিত হওয়ার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্তের আবেদনও জানানো হয়েছে। আদালত এখন সংশ্লিষ্টদের এই রুলের জবাব প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন। এ জন্য দায়ী ব্যক্তিদের অবহেলা–গাফিলতি তদন্ত এবং ইব্রাহিমের জন্য ক্ষতিপূরণ ও পূর্নবাসনের নির্দেশনা চেয়ে রিটটি করা হয়।