বলিউডের তুখোড় অভিনেতা নানা পাটেকর তাঁর অভিনয়শৈলীর জন্য যতটা সমাদৃত, তাঁর বর্ণময় ব্যক্তিগত জীবন ঠিক ততটাই আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। গত ৮ অক্টোবর ভারতের গোয়ায় নিজ বাসভবনে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে ৭৫ বছর বয়সে এই শক্তিশালী অভিনেতার মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পর থেকেই নতুন করে সামনে এসেছে তাঁর পারিবারিক জীবন, বিশেষ করে স্ত্রী নীলকান্তি পাটেকরের সঙ্গে দীর্ঘ ৩৫ বছরের বিচ্ছেদের পরেও আইনি বিচ্ছেদ না হওয়ার বিষয়টি। এই দীর্ঘ সময়ে নানার ব্যক্তিগত জীবন ও সম্পর্কের টানাপোড়েন ঘিরে মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে নানা বিশ্লেষণ। শিশু পুত্রের ট্র্যাজিক মৃত্যু আর দুই বলিউড ডিভার সঙ্গে প্রেমের টানাপোড়েনে ৩৫ বছর ধরে আলাদা থাকার পরেও ডিভোর্স দেননি স্ত্রীকে নানা পাটেকর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। পর্দায় নানা পাটেকরকে যতটা শক্ত মানুষ মনে হয়, ব্যক্তিজীবনে তাঁর গল্প ততটাই আবেগে ভরা। আর সেটি নিয়েই বিস্ময় ও প্রশ্ন জাগছে সকলের মনে।
১৯৭৮ সালে নানা পাটেকর থিয়েটারে কাজ করার সময় নীলকান্তি পাটেকরকে বিয়ে করেন। বিয়ের সময় নীলকান্তি মারাঠি চলচ্চিত্র জগতের পরিচিত মুখ এবং ব্যাংকের কর্মকর্তা ছিলেন। তাঁদের দাম্পত্য জীবনে দুই পুত্রসন্তান ছিল, কিন্তু প্রথম সন্তানকে মাত্র আড়াই বছর বয়সেই হারানোর মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় তাঁদের। এই অকাল মৃত্যু নানা ও নীলকান্তির মানসিক গঠনে গভীর ছাপ ফেলেছিল এবং নানা নিজেও বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে সেই দুঃসহ সময়ের কথা স্মরণ করেছেন। প্রথম সন্তানকে হারানোর শোক তাঁদের সম্পর্কের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল, যা পরবর্তীকালে দাম্পত্য জীবনে বিভেদ সৃষ্টির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পেছনে নানা কারণ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন দাবি প্রকাশিত হয়েছে।
মতের অমিল এবং ব্যক্তিগত পার্থক্যের জেরে নানা ও নীলকান্তি দীর্ঘ ৩৫ বছর আলাদা থেকেছেন। তবে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, দীর্ঘ সময় আলাদা থাকা সত্ত্বেও তাঁদের আইনি বিচ্ছেদ ঘটেনি। ২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর নানা পাটেকরের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগ পর্যন্ত তাঁরা আইনগতভাবে স্বামী-স্ত্রী হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। অনেকে মনে করেন, একে অপরের প্রতি সম্মানবোধ এবং দায়িত্বের কারণেই তাঁরা এই আইনি বিচ্ছেদ থেকে দূরে ছিলেন। তবে আরেকটি জনশ্রুতি রয়েছে যে, অন্য সম্পর্কের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার অপরাধবোধ থেকেও নানা পাটেকর নীলকান্তিকে ডিভোর্স দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি। বোঝাপড়া ও আবেগের বন্ধনে কমতি থাকলেও একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা আর দায়িত্ববোধই হয়তো এর কারণ বলে মনে করছেন অনেকে। আবার নানা সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার অপরাধবোধ থেকেও নানা পাটেকর কাগজে-কলমে ডিভোর্সে যেতে পারেননি নীলকান্তির সঙ্গে, এমন মতামতও উঠে আসছে।
নানা পাটেকরের প্রেমজীবনের প্রসঙ্গ এলে নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় অভিনেত্রী মনীষা কৈরালার কথা প্রথম সারিতে উঠে আসে। ‘অগ্নি সাক্ষী’ ছবির কাজ করার সময় তাঁদের ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে এবং পরবর্তীতে সেই সম্পর্কের গুঞ্জন ভারতীয় গণমাধ্যমে বড় আকার ধারণ করে। নানা নিজে বিভিন্ন সময়ে মনীষার সঙ্গে সম্পর্কের কথা স্বীকার করলেও সম্পর্কটি মোটেও সহজ ছিল না বলে মনীষা পরবর্তীতে বিভিন্ন বক্তব্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন। এছাড়া, ‘আঁচ’ ছবিতে অভিনয়ের সময় অভিনেত্রী আয়েশা জুলকার সঙ্গেও নানা পাটেকরের ঘনিষ্ঠতার খবর চাউর হয়েছিল। যদিও এই সব সম্পর্কের সত্যতা ও গভীরতা নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে এবং অধিকাংশ তথ্যই বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন ও গুঞ্জনের ওপর ভিত্তি করে টিকে আছে। জীবনের এই কঠিন অভিজ্ঞতা তাঁর ব্যক্তিত্ব ও পরবর্তী জীবনেও প্রভাব ফেলেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সন্তান হারানোর শোক, বর্ণাঢ্য অভিনয়জীবন এবং সম্পর্কের টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে নানা পাটেকরের জীবন ছিল ঘটনাবহুল ও জটিলতায় মোড়ানো। ব্যক্তিগত জীবনের এই ভাঙাগড়া ও রহস্য সত্ত্বেও অভিনয়ের প্রতি তাঁর নিবেদন ছিল অবিচল। পর্দার কঠিন চরিত্রের মতোই তাঁর বাস্তব জীবন ছিল আনন্দ ও বেদনার এক সংমিশ্রণ, যেখানে স্ত্রী নীলকান্তির সঙ্গে তাঁর দীর্ঘস্থায়ী অথচ বিচ্ছিন্ন সম্পর্ক আজও সাধারণ মানুষের জন্য এক বড় ধাঁধাঁ হয়ে রয়ে গেছে।