যুক্তরাষ্ট্রে শরতের আগমনের সাথে সাথে প্রবাসী বাঙালি অধ্যুষিত শহরগুলোতে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি এখন তুঙ্গে। বিশেষ করে নিউইয়র্ক ও নিউজার্সি অঞ্চলে এবারের পূজার আয়োজনের ব্যাপ্তি ও বৈচিত্র্য বিশেষভাবে নজর কাড়ছে। বিভিন্ন কমিউনিটি সংগঠন ও স্থানীয় আয়োজক সূত্রের তথ্যানুযায়ী, শুধু এই অঞ্চলেই দুই ডজনেরও বেশি স্থানে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে।
নিউইয়র্কের প্রাণকেন্দ্র টাইমস স্কয়ারের ফাদার ডাফি স্কয়ারে এবার এক বিশেষ উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। ১০ ও ১১ অক্টোবর দুই দিনব্যাপী এই আয়োজনে পূজা-অর্চনা, পুষ্পাঞ্জলি ও প্রসাদ বিতরণের পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের গীতাপাঠের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়া সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্যে থাকছে ধুনুচি নাচ, নৃত্য, সংগীত এবং বাংলাদেশ, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পীদের অংশগ্রহণ। আয়োজকদের প্রকাশিত সূচি অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর ষষ্ঠী পূজার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে এবং এরপর সপ্তমী ও অষ্টমীর বিশেষ পূজা অনুষ্ঠিত হবে। উল্লেখ্য, ১০ অক্টোবর ২০২৬ সালে মহালয়া পড়ায় এবারের টাইমস স্কয়ারের পূজায় এক বিশেষ আধ্যাত্মিক আবহ যুক্ত হয়েছে। তবে ধর্মীয় তিথি অনুযায়ী মহালয়া ও মূল পূজার মধ্যে সূচির পার্থক্য থাকায় আয়োজকেরা এই বিশেষ কর্মসূচি ১০ ও ১১ অক্টোবরেই সম্পন্ন করছেন। নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ার থেকে নিউজার্সি, বস্টন থেকে শিকাগো, আটলান্টা থেকে ক্যালিফোর্নিয়া এবং টেক্সাস থেকে বাফেলো—দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে প্রবাসী বাঙালিরা আয়োজন করছেন দুর্গোৎসব।
নিউইয়র্কে দুর্গাপূজার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯৭০ সালে এই শহরে প্রথমবারের মতো দুর্গাপূজার আয়োজন শুরু হয়েছিল। সময়ের পরিক্রমায় সেই ছোট পরিসরের উৎসব আজ বিশাল মহোৎসবে রূপ নিয়েছে। ইস্ট কোস্ট দুর্গাপূজা অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, তাদের আয়োজনে প্রতিবছর এক হাজারের বেশি মানুষ অংশগ্রহণ করেন। এদিকে, বাংলাদেশ পূজা সমিতি অব নিউইয়র্ক ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে পূজা আয়োজন করে আসছে এবং ২০২৬ সালে তারা তাদের ৩৭তম দুর্গোৎসব উদযাপন করছে। তাদের এ বছরের উৎসব ৩১ অক্টোবর ও ১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি, জার্সি সিটির গার্ডেন স্টেট পূজা কমিটি এবার ৪৫তম বার্ষিক দুর্গোৎসব আয়োজন করছে, যা ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। নিউইয়র্কে দীর্ঘ ঐতিহ্য যুক্তরাষ্ট্রে দুর্গাপূজার ইতিহাস খুব পুরোনো নয়, কিন্তু এর শিকড় বেশ গভীরে। তখন নিউইয়র্কে বাঙালির সংখ্যা ছিল মাত্র কয়েকশ।
নিউইয়র্ক ও নিউজার্সির বাইরেও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে পূজার ব্যাপক প্রস্তুতির খবর পাওয়া যাচ্ছে। রিদম কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন ২৩ ও ২৪ অক্টোবর ফার্মার্স ব্রাঞ্চে তাদের পূজা অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা নিয়েছে। সোইকটের ২০২৬ সালের দুর্গাপূজা ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর ইন্ডিয়ান কালচারাল সেন্টারে অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া অ্যারিজোনাতেও থেমে নেই উৎসবের আমেজ; বাঙালি কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যারিজোনার উদ্যোগে ২৩ থেকে ২৫ অক্টোবর শারদীয় দুর্গোৎসব পালিত হবে।
দুর্গাপূজা এখন কেবল ধর্মীয় উৎসবের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, এটি প্রবাসী বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ২০২১ সালে ইউনেস্কোর মানবতার অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বশীল তালিকায় দুর্গাপূজার অন্তর্ভুক্তি এই উৎসবের আন্তর্জাতিক গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ১৯৭০ সালের ছোট পরিসরের আয়োজন থেকে আজকের টাইমস স্কয়ারের মতো আন্তর্জাতিক জনপরিসরে দুর্গোৎসবের এই বিবর্তন প্রবাসী বাঙালি সমাজের অগ্রযাত্রারই এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। ২০২৬ সালের এই ব্যাপক আয়োজন প্রমাণ করে যে, দুর্গাপূজা এখন শুধু ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্রগুলোতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা নিউইয়র্ক, নিউজার্সি বা বোস্টনের গণ্ডি পেরিয়ে সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে এক বিশাল মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। কোথাও কয়েক দশকের পুরোনো সংগঠনের ঐতিহ্যবাহী পূজা, কোথাও আবার নতুন প্রজন্মের উদ্যোগে গড়ে উঠছে নতুন আয়োজন। ফলে অক্টোবরজুড়ে নিউইয়র্ক-নিউজার্সির বাঙালি অধ্যুষিত এলাকাগুলো কার্যত একেকটি ছোট বাংলায় পরিণত হচ্ছে। টাইমস স্কয়ারের আয়োজনটির একটি বিশেষ দিক হলো—এটি প্রচলিত বাঙালি কমিউনিটি হলের বাইরে নিউইয়র্কের সবচেয়ে দৃশ্যমান জনপরিসরে দুর্গাপূজাকে নিয়ে এসেছে। প্রতিদিন বিশ্বের নানা দেশ থেকে আসা পর্যটক ও দর্শনার্থীদের সামনে দেবী দুর্গার আরাধনা, বাংলা সংগীত, নৃত্য ও বাঙালি সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।