লাওসের রাজধানী ভিয়েনতিয়েন থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত বান কিউন বিমানঘাঁটিতে চীনের নতুন সামরিক উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট প্রতিষ্ঠান ভ্যানটরের তোলা ছবিতে সেখানে আটটি হালকা আক্রমণাত্মক যুদ্ধবিমান এবং দুই ডজনেরও বেশি সামরিক ও সহায়ক যান শনাক্ত করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিমানগুলোর আকৃতি চীনের তৈরি হংদু জেএল-৮ বা কে-৮ মডেলের সাথে হুবহু মিলে যায়। দুই আসনের এই যুদ্ধবিমান মূলত প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হলেও এগুলো দিয়ে হালকা ধরনের আক্রমণাত্মক অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর ধারণ করা স্যাটেলাইট ছবিতে রানওয়ের আশেপাশে ব্যাপক কর্মযজ্ঞের চিত্র ধরা পড়েছে। কয়েক মাস আগের ছবির সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, আগে কৃষিজমি ও কাঁচা রাস্তার জায়গায় এখন পাকা রানওয়ে এবং নতুন ভবন নির্মিত হয়েছে। চীন গত ২৯ সেপ্টেম্বর বান কিউনে এই নতুন কেন্দ্র চালুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছিল। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যমতে, লাওসের বিমানবাহিনীর পাইলটদের দক্ষতা বৃদ্ধিই এই ‘সহায়তা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ স্থাপনের মূল লক্ষ্য এবং এটি কোনো তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে পরিচালিত নয়।
সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত এই স্থাপনা সম্প্রসারণের ধরন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ভবিষ্যতে এর কার্যক্রম কেবল প্রশিক্ষণে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। রানওয়ের গঠন দেখে বোমারু বিমান কিংবা নজরদারি ও গোয়েন্দা বিমান পরিচালনার উপযোগী সক্ষমতা তৈরির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। সিঙ্গাপুরভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক কলিন কোহের মতে, বান কিউনের এই ঘাঁটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীনের প্রথম পূর্ণাঙ্গ পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের মূল্যায়ন অনুযায়ী, এটি এখনো বড় ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনার মতো সক্ষমতা অর্জন করেনি। তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান ও রয়টার্স। এসব স্থাপনা যুক্ত হলে প্রশিক্ষণকেন্দ্রটির সামরিক ব্যবহার আরও বিস্তৃত হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে বলে তারা মনে করছেন। ফলে স্থাপনাটির ভবিষ্যৎ সামরিক ব্যবহার কতটা বিস্তৃত হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এ ধরনের সামরিক অবকাঠামো গড়ে তোলা চীনের সামরিক কৌশলের এক নতুন দিগন্ত। এর আগে কম্বোডিয়ার রিয়াম নৌঘাঁটিতেও চীন লজিস্টিক ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র তৈরি করলেও সেখানে বিমান চলাচলের কোনো রানওয়ে ছিল না। লাওসের এই ঘাঁটি চীনের জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মূল ভূখণ্ডে সরাসরি যুদ্ধবিমান পরিচালনার পথ প্রশস্ত করতে পারে। বিষয়টি নিয়ে ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোও সতর্ক দৃষ্টি রাখছে। থাইল্যান্ডের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, লাওসের সার্বভৌম অধিকারের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা রয়েছে, তবে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ব্যাংকক পরিস্থিতির ওপর নিয়মিত নজর রাখবে। তবে পারস্পরিক আস্থা বজায় রাখতে ব্যাংকক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।
ঐতিহাসিকভাবে বান কিউন ঘাঁটিটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকের ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় এখানে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন সামরিক কার্যক্রম পরিচালিত হতো। আজ একই স্থানে চীনের সামরিক সরঞ্জামের উপস্থিতি ভূরাজনৈতিক সম্পর্কের নতুন এক মেরুকরণ তৈরি করেছে। আফ্রিকা ও দক্ষিণ চীন সাগরের বাইরে বিভিন্ন দেশে চীনের বড় ধরনের সামরিক অবকাঠামোর নজির খুব একটা নেই, যে কারণে এই ঘাঁটি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে কৌতুহল ও শঙ্কা উভয়ই রয়েছে।
যদিও চীন এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য দেয়নি এবং তাদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধেও তাৎক্ষণিক সাড়া দেয়নি, তবু স্যাটেলাইটের এই চিত্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দেশটির ক্রমবর্ধমান সামরিক পদচিহ্নকে স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে। লাওসের সরকারের পক্ষ থেকেও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি। গোলাবারুদ, জ্বালানি সংরক্ষণাগার কিংবা বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মতো আরও সামরিক অবকাঠামো এখানে যুক্ত হয় কি না, এখন সেই দিকেই নজর রাখছেন পর্যবেক্ষকরা।