সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার জেরে ফ্লাইট চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন শত শত প্রবাসী কর্মী। হযরত শাহ্জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অপেক্ষমাণ শাওন জানান, তার পূর্বনির্ধারিত ১৩ই অক্টোবর রিয়াদগামী ফ্লাইট বাতিল হওয়ার পর তিনি বাধ্য হয়ে নিজের টাকায় নতুন টিকিট কিনে মদিনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করছেন। শাওন বলেন, কোম্পানি তাকে টিকিট দিলেও ফ্লাইট বাতিলের পর তাদের কাছ থেকে কোনো সাড়া মেলেনি। ৬৫ হাজার টাকায় নতুন টিকিট কেনা এবং মদিনা থেকে প্রায় ৮৫০ কিলোমিটার পথ সড়কপথে রিয়াদে যেতে আরও ২০ হাজার টাকা খরচ হবে তার। ভিসার মেয়াদ ১৮ তারিখের মধ্যে শেষ হওয়ার শঙ্কায় ধারদেনা করে অতিরিক্ত এই অর্থ ব্যয় করছেন তিনি। হযরত শাহ্জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ৩ নম্বর গেটের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় শাওন। সন্ধ্যা ৭টা ৫ মিনিটে তার সৌদি আরবের মদিনার ফ্লাইট। মদিনায় পৌঁছে প্রায় ৮৫০ কিলোমিটার দূরের কর্মস্থল রিয়াদে সড়ক পথে যেতে হবে। গতকাল সরজমিন বিমানবন্দরে গেলে ভুক্তভোগী সৌদিপ্রবাসী কয়েকজন এমন ভোগান্তির চিত্র তুলে ধরেন। সৌদি আরবগামী যাত্রীরা দু’-একজন করে আসছেন, ভেতরে ঢুকছেন। শাওন বলেন, আমার কোম্পানির টিকিটের ফ্লাইট ১৩ তারিখ ছিল। কোম্পানি যাওয়া-আসার টিকিট কেটে দিয়েছিল। এখন যদি আমি গিয়ে ভিসার মেয়াদ না বাড়াই তাহলে আরও বড় বিপদে পড়বো। সেখান থেকে দাম্মাম যেতে আরও ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ। তিনি বলেন, আমার ভিসার এখনো ১১ মাস মেয়াদ আছে। কিন্তু প্রথম হোঁচট খান বিমানবন্দরে।
একইভাবে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন শালিক নামের আরেক প্রবাসী। মঙ্গলবার ঢাকা থেকে দাম্মামগামী ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় তিনি পুনরায় টিকিট রি-ইস্যু করেন, কিন্তু সেটিও বাতিল হয়। শেষ পর্যন্ত তাকে মদিনাগামী ফ্লাইটে যেতে হচ্ছে, যেখান থেকে দাম্মামের দূরত্ব প্রায় ১৩০০ কিলোমিটার। শালিক জানান, অতিরিক্ত খরচ তো বটেই, ছুটি শেষে নির্দিষ্ট সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে না পারায় কফিলের সঙ্গে সমস্যা তৈরির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রথমবার বিদেশ গমনেচ্ছু শামসুল হকের অভিজ্ঞতা আরও বেদনাদায়ক। লোন নিয়ে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া শামসুল জানান, তার ফ্লাইট বাতিল হওয়ার পর এজেন্সিকে অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা দিয়ে নতুন টিকিট জোগাড় করতে হয়েছে, যা তার কিস্তি পরিশোধে বড় চাপ সৃষ্টি করবে। চাকরি বাঁচাতে শাওনের মতো এমন অনেকেই বাড়তি খরচে বিকল্প পথে ফিরছেন কর্মস্থলে। কফিলের সঙ্গে কথা বলে ছুটি বাড়ানো যেতো। এদিকে, প্রথমবার বিদেশের মাটিতে পা রাখবেন শামসুল হক। শামসুল বলেন, টিকিট বাতিল হওয়ার খবর শুনেই বনানীতে এজেন্সির কাছে চলে যাই। এজেন্সি বলে, আমাদেরকে আবার টিকিট দেয়া হবে। সময়মতো না যেতে পারলে কিস্তি চালানো সম্ভব না। বাড়ির জমিজমার কাগজপত্র বন্ধক দিয়ে লোন নিয়েছি।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই সংকটে এ পর্যন্ত সরাসরি ও ট্রানজিট মিলিয়ে মোট ১০৩টি ফ্লাইট বিঘ্নিত হয়েছে, যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১৫ হাজার ৭৭৯ জন যাত্রী। সরাসরি ফ্লাইটের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ১৭টি, ইউএস-বাংলার ১০টি, সৌদিয়ার ৮টি ও রিয়াদ এয়ারের ৭টিসহ মোট ৪২টি ফ্লাইট বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ট্রানজিট ফ্লাইটের মধ্যে ইন্ডিগোর ২২টি, এমিরেটসের ১৪টি, কাতার এয়ারওয়েজের ৮টি, সালাম এয়ারের ৭টি, ফ্লাইদুবাইয়ের ৬টি, এয়ার ইন্ডিয়ার ৩টি ও ইজিপ্ট এয়ারের ১টিসহ মোট ৬১টি ফ্লাইট সংকটের মুখে পড়েছে। বাপের ভিটেমাটি বিক্রি করে যাচ্ছেন সৌদিতে। সেখানে লোকজন আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। এতে বলা হয়, ফ্লাইটগুলোর বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও নতুন সময়সূচি যথাসময়ে জানানো হবে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স রিয়াদ ও দাম্মামগামী ফ্লাইট স্থগিতের সময়সীমা ১৮ই অক্টোবর পর্যন্ত বাড়িয়েছে। তবে যাত্রীদের চাপ বিবেচনায় মদিনা রুটে বোয়িং ৭৮৭-এর বদলে বড় উড়োজাহাজ বোয়িং ৭৭৭ ব্যবহার করা হচ্ছে, যা প্রতিটি ফ্লাইটে ১৪৮টি বাড়তি আসন নিশ্চিত করবে। পাশাপাশি জেদ্দা রুটে আরও তিনটি অতিরিক্ত ফ্লাইট পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে; সৌদিগামী যাত্রীদের ভিড় কমেছে এবং ফ্লাইট সংখ্যাও স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম দেখা যাচ্ছে।