পরিবার ও সমাজের নানা প্রতিবন্ধকতা জয় করে নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন মিতু আক্তার। মুন্সিগঞ্জের লৌহজংয়ের বেজগাঁও গ্রামের মেয়ে মিতু ব্যক্তিগত জীবনে চরম প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। ২০১৬ সালের নভেম্বরে বিয়ে হওয়ার পর ২০১৭ সালের ১০ অক্টোবর তাঁর কোলজুড়ে আসে পুত্রসন্তান সাফাত নূর আলিফ। তবে ২০১৯ সালে ব্যক্তিগত জীবনে বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়ে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের অভিজ্ঞতা হয় তাঁর। সেই কঠিন সময়ে নিজের ও সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব একা কাঁধে তুলে নিতে হয় মিতুকে। পরিবার, সমাজ কিংবা জীবনের প্রতিকূল পরিস্থিতি কোনো কিছুই মানুষের স্বপ্ন ও ইচ্ছাশক্তিকে দমাতে পারে না—যদি থাকে ঘুরে দাঁড়ানোর অদম্য জেদ। আমাদের সমাজে অনেক নারীই প্রতিনিয়ত নীরবে লড়াই করে যান। তেমনই এক সংগ্রামী নারী মিতু আক্তার। জীবনের নানা ঝড়ে যাঁর তরি প্রায় ডুবে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল, কিন্তু তিনি হার না মেনে নিজের মেধা, পরিশ্রম ও সাহসিকতায় লিখেছেন এক নতুন বিজয়ের উপাখ্যান। নদীর তীরের শান্ত স্নিগ্ধ এক জনপদ মুন্সিগঞ্জের লৌহজং, আর সেখানকারই একটি চেনা গ্রাম বেজগাঁও। মানুষের জমির মাপজোখ আর হিসাব-নিকাশ করেই তাঁর সারা দিন কাটত। আর মা শিউলি বেগম ছিলেন পুরো পরিবারের মায়াবী ছায়া। মিতু আক্তারের ভাই-বোন মিলিয়ে মোট চারজন—তিন ভাই আর সবার ছোট একমাত্র বোন মিতু আক্তার। ভাই-বোনদের আদুরে স্নেহে আর মা-বাবার ছায়ায় এভাবেই কেটেছিল তাঁর শৈশব ও কৈশোর। সময়ের পালাবদলে ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে তাঁর বিয়ে হয়েছিল। ২০১৯ সালের দিকে মিতুর ব্যক্তিগত জীবনে বড় ধরনের ঝড় বয়ে যায়। উচ্চশিক্ষার সনদ না থাকা এবং পরিবারের পর্যাপ্ত সমর্থন না পাওয়ায় নিজের ও সন্তানের দায়িত্ব নিতে তাঁকে একাই লড়তে হয়; সইতে হয় নানা সামাজিক কটুকথাও। মিতু আবারও গভীর হতাশায় নিমজ্জিত হন। মিতু আক্তার বলেন, ‘আমার আর যাওয়ার কোনো জায়গা ছিল না।
উচ্চশিক্ষার অভাব এবং চারপাশের মানুষের নেতিবাচক মন্তব্যের মাঝেও মিতু হাল ছাড়েননি।
২০২০ সালের শেষদিকে ভাইয়ের কাছ থেকে একটি পুরোনো ও ভাঙা ল্যাপটপ নিয়ে তিনি গ্রাফিক ডিজাইনের কাজ শেখা শুরু করেন। কিন্তু সেই ল্যাপটপটি আবার নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তিনি নতুন করে হতাশায় পড়েন। সে সময় মায়ের সহযোগিতায় তিনি ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের ওপর একটি কোর্স করার সিদ্ধান্ত নেন। মিতুর মা নিজের কানের দুল বিক্রি করে টাকা জোগাড় করে দিয়েছিলেন, যা মিতুকে ঘুরে দাঁড়ানোর বড় শক্তি জুগিয়েছে। পরবর্তীতে ক্রিয়েটিভ আইটিতে ভর্তি হয়ে তিনি এসইও ও ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে নিজের দক্ষতা শানিত করেন। মাকে বোঝালাম যে আমাকে কোনোভাবে টাকার ব্যবস্থা করে দিলে আমি ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের একটি কোর্স করব। সেই টাকা আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, ‘যেদিন আয় করবে, সেদিন আমাকে আবার বানিয়ে দিয়ো। পরবর্তী সময়ে আগ্রহের জায়গা থেকে এসইও (সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন) ও ডিজিটাল মার্কেটিং নিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে কাজ শুরু করেন তিনি।
কঠোর পরিশ্রমের ফসল হিসেবে ফাইভআরে এক ইতালীয় গ্রাহকের কাছ থেকে ১২০ ডলারের প্রথম কাজের সুযোগ পান তিনি। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ধীরে ধীরে ফাইভআরে লেভেল ২ এবং আপওয়ার্কে টপ রেটেড ফ্রিল্যান্সার হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেন। নিজের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে তিনি গড়ে তোলেন ‘বি মার্কেটিং এজেন্সি’। বর্তমানে তাঁর এই প্রতিষ্ঠানে ১০ জন তরুণ-তরুণী রিমোটলি কাজ করছেন। এছাড়া ২০২৩ সালে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করার পর তিনি বর্তমানে বিবিএ করছেন। শূন্য থেকে শুরু করে আজ তিনি কেবল নিজের ভাগ্যই বদলাননি, হয়ে উঠেছেন আরও ১০ জন তরুণ–তরুণীর অনুপ্রেরণা। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর তাগিদে তিনি ইন্টারনেটে সম্মানজনক কাজের খোঁজ শুরু করেন—যে কাজ ঘরে বসেই তাঁকে আর্থিক সচ্ছলতা ও আত্মমর্যাদা এনে দেবে। কঠোর পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ের জোরে তিনি আউটসোর্সিং কাজ দেওয়া–নেওয়ার ওয়েবসাইট ফাইভআরে এক ইতালীয় গ্রাহকের কাছ থেকে প্রথম ১২০ ডলারের কাজ পান। অবশেষে ২০২৩ সালে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হন।
নিজের সংগ্রামের কথা স্মরণ করে মিতু আক্তার বলেন, প্রতিকূলতা পেরিয়ে আজ আমি নিজের ঠিকানা গড়েছি। একসময় প্রতারণার শিকার হয়েছিলাম এবং মানুষ বলেছিল আমি পারব না, কিন্তু নিজের ভেতরের শক্তিকে খুঁজে নিয়েছি। মায়ের বিক্রি করা কানের দুল তিনি আয়ের টাকা দিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছেন এবং নিজের উপার্জিত অর্থে স্কুটি কিনেছেন ও জমি ক্রয় করেছেন। নিজের আত্মমর্যাদা ধরে রাখতে বিচ্ছেদের পর তিনি বাবার বাড়ি না ফিরে আলাদা বাসা ভাড়া নিয়ে ছেলেকে নিয়ে থাকছেন। ড্রাইভিং শিখে লাইসেন্সও সংগ্রহ করেছেন তিনি।
ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে মিতু বলেন, বর্তমান যুগে অনলাইন ব্যবসার প্রসারে এই খাতের ভূমিকা অপরিসীম। তরুণদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ধৈর্য ও ধারাবাহিকতা থাকলে যে কেউ এই পেশায় সফল হতে পারেন। তিনি শুধু নিজের সাফল্যের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকতে চান না। যারা পারিবারিক বা সামাজিকভাবে পিছিয়ে আছে, বিশেষ করে নারীদের জন্য প্রশিক্ষণ ও ফ্রিল্যান্সিং শেখার একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির কাজ শুরু করেছেন তিনি। মিতুর স্বপ্ন আরও বেশি নারীকে দক্ষ ও স্বাবলম্বী করে তোলা। বাবা মো. আবুল হোসেন শেখ, পেশায় একজন সার্ভেয়ার বা আমিন।