1. admin@ajkerbasundhara.com : admin :
শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৪৯ অপরাহ্ন

দুই শতাব্দী পেরিয়ে এখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বী মুক্তাগাছার মণ্ডা

স্টাফ রিপোর্টার
  • প্রকাশ : শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬

ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে মণ্ডার নাম। প্রায় ২০০ বছর ধরে এই জনপদের ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে এই বিশেষ মিষ্টি। কালের পরিক্রমায় মিষ্টির বাজারে অসংখ্য নতুন নাম এলেও গোপাল পালের হাতে শুরু হওয়া মণ্ডার সেই চিরায়ত স্বাদ আজও অমলিন। বর্তমানে এই মণ্ডা কেবল একটি ব্যবসা নয়, বরং ময়মনসিংহ অঞ্চলের ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক গর্বিত ধারক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। পূজা-পার্বণ এলেই বাড়ে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার বিখ্যাত মণ্ডার চাহিদা। বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজায় এই মিষ্টির কদর থাকে বেশি। ভক্তরা পূজামণ্ডপে মণ্ডা নিবেদন করেন। স্বাদ ও বৈশিষ্ট্যের কারণে অল্প সময়েই এর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১৮২৪ সালে রাম গোপাল পাল প্রথম এই মণ্ডা তৈরি করেন। তার পরিবারের সংরক্ষিত ইতিহাস বিষয়ক পুস্তিকায় এ তথ্য পাওয়া যায়। সে সময় মুক্তাগাছার তৎকালীন জমিদার মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী এই মণ্ডার স্বাদে অভিভূত হয়ে গোপাল পালকে উৎসাহিত করেছিলেন। জমিদারবাড়ির অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য এই মিষ্টি পরিবেশনের পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়িক সহায়তাও দিয়েছিলেন তিনি। প্রয়াত রমেন্দ্রনাথ পালের লেখা ‘গোপাল পালের প্রসিদ্ধ মণ্ডা আলেখ্য’ পুস্তিকা অনুযায়ী, ১৮২৪ সালে গোপাল পাল প্রথম এই মিষ্টি তৈরি করেন।

কালের বিবর্তনে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ সরকার মণ্ডাকে ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) এটিকে দেশের ২৬তম জিআই পণ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। মণ্ডার এই অনন্য স্বীকৃতিকে স্থানীয় মানুষ ও সংশ্লিষ্টরা গর্বের সাথে দেখছেন। স্বাদে ও ঐতিহ্যে আলাদা এই মিষ্টির টানে দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন মুক্তাগাছায়।

গোপাল পালের উত্তরসূরি ‘রামেন্দ্রনাথ পাল অ্যান্ড ব্রাদার্স’ বর্তমানে দোকানটির পরিচালনা করছে। দোকানের ভেতরে কাঁচের শোকেসে রক্ষিত গোপাল পালের একটি কাঠের ভাস্কর্য পর্যটকদের নজরে পড়ে। জানা যায়, স্থানীয় কাঠমিস্ত্রি স্বরূপ সূত্রধর প্রায় ১২৪ বছর আগে এই ভাস্কর্যটি তৈরি করেছিলেন, যা এখন এই দোকানের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটিও দোকানটির পরিচিত প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান অন্যতম মালিক রবীন্দ্রনাথ পাল জানান, বাজারের প্রতিযোগিতায় তাদের ব্যবসায়িক কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি।

এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আমরা এখনো মণ্ডা তৈরির প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি অনুসরণ করছি।

সেরা মানের ছানা ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ বজায় রাখাই আমাদের মূল চালিকাশক্তি।

ব্যবসার চেয়ে একে হৃদয়ের আবেগ ও শত বছরের ইতিহাস হিসেবেই আমরা দেখি। দোকানের ব্যবস্থাপক দুলাল দাস পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, ঐতিহ্যের মান ঠিক রাখতে তাদের আর কোনো শাখা খোলার পরিকল্পনা নেই। বর্তমানে সাধারণ মণ্ডার কেজি ৭০০ টাকা এবং নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত পাওয়া যায় খেজুরের গুড় দিয়ে তৈরি বিশেষ মণ্ডা, যার দাম ৮০০ টাকা কেজি।

দীর্ঘ এই পথচলায় মণ্ডার স্বাদ নিতে দেশ-বিদেশের অনেক নামি-দামি ব্যক্তিত্ব এই দোকানে এসেছেন। তালিকাটি বেশ দীর্ঘ—বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, আইনজীবী কামাল হোসেন, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান, চিকিৎসক বিধান চন্দ্র রায়, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও রণদা প্রসাদ সাহার মতো ব্যক্তিত্ব মণ্ডার স্বাদ নিয়েছেন। বিনোদন জগতের নায়করাজ রাজ্জাক, কবরী, শাবানা, প্রবীর মিত্র, সোহেল রানা, টেলি সামাদ, বুলবুল আহমেদ, আনোয়ার হোসেনসহ অনেকে এখানে এসেছেন। এছাড়া বিদেশি পর্যটক থেকে শুরু করে ব্রিটিশ রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ও ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মতো ব্যক্তিবর্গও এই মণ্ডার পরিচিতি পেয়েছেন।

অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রকাশিত লোনলি প্ল্যানেটের ১৯৯৬ সালের ভ্রমণ নির্দেশিকা ‘বাংলাদেশ: এ লোনলি প্ল্যানেট ট্রাভেল সার্ভাইভাল কিট’-এ মুক্তাগাছার মণ্ডার বিশেষ উল্লেখ রয়েছে। লেখক অ্যালেক্স নিউটন, বেটসি ওয়াগেনহাউজার ও জন মারে বইটিতে মণ্ডাকে দেশের সেরা মিষ্টি হিসেবে অভিহিত করেছেন।

ময়মনসিংহ আঞ্চলিক প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কমিটির সদস্যসচিব ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেনের মতে, মণ্ডা এই অঞ্চলের ইতিহাসের অংশ। এটি পর্যটকদের আকর্ষণ করে, যা আমাদের গর্বের বিষয়। সম্প্রতি আনন্দ মোহন কলেজের একদল শিক্ষার্থী ঐতিহ্যবাহী এই দোকানে এসে নিজেদের শেকড়ের সাথে যুক্ত হতে পেরে আনন্দিত বোধ করেন। শিক্ষার্থী আশরাফুন নাহারের ভাষায়, তারা অভিভূত এবং চান যেন এই ঐতিহ্য শতাব্দীজুড়ে টিকে থাকে।

উল্লেখ্য, বর্তমান সময়ে স্থানীয় নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেও মণ্ডার এই ঐতিহ্যময় উপস্থিতি আলোচনার কেন্দ্রে থাকে। তবে একইসাথে সৌদিতে ২ বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড ও ঢাকা-রিয়াদ কূটনৈতিক সমন্বয়হীনতা, ডেঙ্গুর প্রকোপে একদিনে ৫ জনের মৃত্যু ও হাসপাতালে ১৮৯৮ জন ভর্তি এবং প্রধানমন্ত্রী জাপান সফরকালে রাষ্ট্রদূতকে ঢাকায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যসহ নানা সমসাময়িক সংবাদ দেশের মানুষের নজর কাড়ছে। এছাড়া সম্প্রতি গাজীপুরের কার্টন কারখানায় অগ্নিকাণ্ড, শিশুর উদ্বেগ ও বিষণ্নতা নিয়ে নতুন গবেষণার তথ্য এবং সাফের জন্য বাংলাদেশের প্রাথমিক দল ঘোষণার মতো বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বের সাথে আলোচিত হচ্ছে। সাফের জন্য বাংলাদেশের প্রাথমিক দল ঘোষণা, প্রথমবার ডাক পেলেন রোনান-মাহি।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
২০২৬ © আজকের বসুন্ধরা কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
Theme Customization By NewsSun