র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে পুলিশের আওতাধীন ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) নামে একটি নতুন বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের বিধান রেখে জাতীয় সংসদে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’-এর বিল উত্থাপন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের চতুর্থ দিনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন। বিলটি যাচাই-বাছাই করে প্রতিবেদনসহ চার কার্যদিবসের মধ্যে সংসদে ফেরত পাঠানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত এই আইনের মূল লক্ষ্য হলো জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সন্ত্রাসবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন এবং পুলিশ বাহিনীকে আধুনিক ও পেশাদার সহায়তা প্রদান করা। সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ ও অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনী থেকে কর্মকর্তা ও সশস্ত্র সদস্যদের প্রেষণে নিয়োগের মাধ্যমে এই ইউনিট গঠন করবে, যার সদর দপ্তর হবে ঢাকায়। ইউনিটের মহাপরিচালক হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক পদমর্যাদার কোনো কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হবে। মহাপরিচালক ইউনিটের প্রশাসনিক, আর্থিক ও অপারেশনাল সব ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন।
এসআরবির দায়িত্বের পরিধি বেশ বিস্তৃত। এর মধ্যে রয়েছে বেআইনি অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধার, মাদক ও সাইবার অপরাধ দমন, গুম ও ভূমিদস্যুতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। এছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন, মানবপাচার, অপহরণের মতো গুরুতর অপরাধের তদন্ত এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্যান্য বাহিনীকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করবে এই ইউনিট। আদালত, সরকার বা পুলিশ মহাপরিদর্শকের নির্দেশে এসআরবি যেকোনো ফৌজদারি অপরাধ তদন্ত করতে পারবে। তদন্তের প্রয়োজনে তাদের নিজস্ব হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ ব্যবহারের বিধান রাখা হয়েছে।
আইনে বলা হয়েছে, এসআরবি কোনো স্থানে প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দ বা গ্রেপ্তারের ক্ষমতা পাবে, তবে তা ফৌজদারি কার্যবিধি ও প্রচলিত আইন মেনে করতে হবে। গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি বা জব্দ করা আলামত এসআরবি নিজের কাছে আটকে রাখতে পারবে না; দ্রুত নিকটস্থ থানার হেফাজতে হস্তান্তর করে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে প্রতিবেদন দিতে হবে। তদন্তের দায়িত্ব মহাপরিচালক সাব-ইন্সপেক্টর বা তার ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর অর্পণ করতে পারবেন।
এসআরবি সদস্যদের শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়ে কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। কর্তব্যরত অবস্থায় নেশাগ্রস্ত থাকা, সহকর্মীর ওপর অসদাচরণ, অনুমতি ছাড়া কর্মস্থল ত্যাগ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আদেশ অমান্য করা, বলপূর্বক অর্থ আদায়, জমি দখল, সম্পদ চুরি বা অপরাধীকে আটক করতে ব্যর্থ হওয়াকে শৃঙ্খলা লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করা হবে। শাস্তিস্বরূপ চাকরি থেকে বরখাস্ত, বাধ্যতামূলক অবসর, পদাবনতি, জরিমানা বা তিরস্কারের মতো ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। তবে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ছাড়া কাউকে শাস্তি দেওয়া যাবে না এবং বিভাগীয় আদেশের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে আপিলের সুযোগ থাকবে।
সদস্যদের ব্যক্তিগত অভিযোগ ও অভ্যন্তরীণ সংক্ষোভ নিরসনে একটি ‘অভিযোগ প্রতিকার কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই কমিটিতে এসআরবির একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিনিধি, একজন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা এবং মানবাধিকার বিষয়ে অভিজ্ঞ একজন ব্যক্তি থাকবেন। এছাড়া ইউনিটের সব সদস্যের জন্য বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে এবং অপারেশনাল তথ্য বিশ্লেষণের জন্য সদর দপ্তরে একটি গবেষণা সেল কাজ করবে।
আইনটি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে র্যাব সংক্রান্ত বিদ্যমান বিধানগুলো রহিত হয়ে যাবে। র্যাবের জনবল, ক্ষমতা, তহবিল, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, রেকর্ডপত্র ও দায়-দেনা এসআরবির অনুকূলে স্থানান্তরিত হবে। বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অপরাধের পরিবর্তিত ধরন ও জাতীয় নিরাপত্তার নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি আধুনিক, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক বিশেষায়িত ইউনিটের প্রয়োজন থেকেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন এই ইউনিটের প্রতিটি কার্যক্রমে আইনের শাসন, স্বচ্ছতা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিলে এসআরবি সদস্যদের বিভিন্ন ধরনের শৃঙ্খলা লঙ্ঘনের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।