দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া পুনরায় চালু হয়েছে। সরকার দেশটিতে কর্মী পাঠানোর জন্য সরকারি-বেসরকারি মিলে মোট ৩৩৮টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে তালিকাভুক্ত করার অনুমোদন পেয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, দুই দেশের সমঝোতার ভিত্তিতে এই প্রক্রিয়া এখন থেকে সক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে।
মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, মালয়েশিয়ার নির্ধারিত যোগ্যতার মানদণ্ড পূরণ সাপেক্ষে এই তালিকায় স্থান পেয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল)। এর বাইরে ২৫টি বেসরকারি প্রসেসিং বা সার্ভিস এজেন্সি এবং আরও ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে কর্মী নিয়োগের জন্য সম্মতি দেওয়া হয়েছে। ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর সম্পাদিত সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ অনুযায়ীই এই এজেন্সি নির্বাচনের কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশের বিশেষ অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ ১০ হাজার কর্মীকে সম্পূর্ণ বিনা খরচে অর্থাৎ ‘জিরো কস্ট’ পদ্ধতিতে নিয়োগের বিষয়ে নীতিগত সম্মতি জানিয়েছে। বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হলো এই শ্রমবাজারকে স্বচ্ছ, সুশৃঙ্খল এবং সব পক্ষের অংশগ্রহণমূলক একটি মডেল হিসেবে গড়ে তোলা। একপর্যায়ে বাংলাদেশের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কিছু শর্তে নমনীয়তা দেখায় মালয়েশিয়া।
নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর কথা জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলো মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তাদের কাছ থেকে সরাসরি চাকরির চাহিদা বা জব অর্ডার সংগ্রহ করতে পারবে। এরপর এজেন্সিগুলো নিজেরাই কর্মী নির্বাচন ও নিয়োগের অন্যান্য আইনি কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারবে। এছাড়া প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক জটিলতা নিরসনে তালিকাভুক্ত ২৫টি প্রসেসিং এজেন্সি এবং বোয়েসেল সার্বিক সহায়তা প্রদান করবে। সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি মেনে এসব কর্মীর নিয়োগ কার্যক্রমও পরিচালনা করতে পারবে তারা। এ কারণে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে সময় প্রয়োজন হচ্ছে।
বিএমইটি বা জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর ছাড়পত্র পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিটি এজেন্সির স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট এজেন্সি নিজেই তাদের কর্মীদের জন্য ছাড়পত্র সংগ্রহ করতে পারবে, যেখানে প্রসেসিংয়ের দায়িত্বে থাকা এজেন্সিগুলো অনাপত্তিপত্র বা এনওসি প্রদান করবে। এতে প্রতিটি রিক্রুটিং এজেন্সির ব্যবসায়িক স্বাধীনতা ও জবাবদিহি বজায় থাকবে।
অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মীদের স্বার্থ সুরক্ষা সরকারের অন্যতম মূল লক্ষ্য। মালয়েশিয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মীরা যেন কোনো প্রকার অতিরিক্ত আর্থিক চাপে না পড়েন, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করছে। সাশ্রয়ী ও নিরাপদ উপায়ে কর্মী পাঠানো নিশ্চিত করতে এজেন্সিগুলোকে যথাযথ আইন ও নিয়মকানুন মানার কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য মেডিকেল সেন্টারের তালিকা নিয়ে চলমান প্রক্রিয়া সম্পর্কেও বিস্তারিত জানানো হয়েছে। শ্রমবাজার দ্রুত চালু করার স্বার্থে বর্তমানে বিতর্কিত ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িত মেডিকেল সেন্টারগুলো বাদ দিয়ে মালয়েশিয়া সরকার অনুমোদিত অবশিষ্ট সেন্টারের মাধ্যমে স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুরু হবে। তবে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে মালয়েশিয়ার তিন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি দল সরাসরি বাংলাদেশে এসে মেডিকেল সেন্টারগুলো সরজমিনে যাচাই-বাছাই করবে এবং নতুন তালিকা চূড়ান্ত করবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এজেন্সিগুলোর যোগ্যতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছে যে, মেডিকেল সেন্টারগুলো সবসময় বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারিতে থাকবে। কোনো ধরনের অনিয়ম প্রমাণিত হলে সেই সেন্টারের কার্যক্রম তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হবে। এছাড়া পর্যায়ক্রমে নতুন মেডিকেল সেন্টার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে, যা পরবর্তীতে যথাযথভাবে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানানো হবে। কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট সেন্টারের কার্যক্রম বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব ও দূরদর্শী দিকনির্দেশনা প্রদানের জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে সরকার। একই সঙ্গে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী, দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ইতিবাচক মনোভাব ও সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানানো হয়েছে। উভয় দেশের শ্রম সহযোগিতার ক্ষেত্রে এটি একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা বলে মন্ত্রণালয় মনে করছে। প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের পর তার প্রথম সরকারি বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়াকে বেছে নেন এবং দেশটির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করেন বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।