1. admin@ajkerbasundhara.com : admin :
মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬, ০৬:৫৫ অপরাহ্ন

‘চারপাশে ছড়িয়ে ছিল কঙ্কাল-খুলি’, রোহিঙ্গাদের ওপর আরাকান আর্মির হত্যাযজ্ঞ

স্টাফ রিপোর্টার
  • প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬

২০২৪ সালের জুলাই মাস। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বুথিডং শহরের উইরান গ্রাম হইয়ার সিরি তখন পুরোপুরি জনশূন্য, যেন এক ধ্বংসস্তূপ। প্রাণভয়ে পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গা মুসলিম গ্রামবাসীদের কয়েকজন, যেমন ওমর আহমদ, তাদের ফেলে আসা কিছু জিনিসপত্র সংগ্রহ করতে গোপনে গ্রামে ফিরে আসেন। কিন্তু দুই মাস আগে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ এক গণহত্যার চিহ্ন দেখে তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।

ওমর আহমদ সেই বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘গ্রামে কোনো গবাদিপশু বা হাঁস-মুরগি অবশিষ্ট ছিল না, অথচ আগে প্রতিটি বাড়িতেই এগুলো ছিল। শুনলাম আরাকান আর্মি সব লুট করে নিয়ে গেছে। এরপর আমি ধানক্ষেতের দিকে যাই, যেখানে আমার নিকটাত্মীয়সহ প্রায় ৮০ জন গ্রামবাসীকে হত্যা করা হয়েছিল। সেখানে গিয়ে দেখি চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে কঙ্কাল আর মানুষের খুলি। মাংস পচে গেলেও লাশের কাপড়গুলো তখনও অক্ষত ছিল।’ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের বর্ণনা উঠে এসেছে। সোমবার (১৮ মে) সংস্থাটির ওয়েবসাইটে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, ২০২৪ সালের ২ মে উত্তর রাখাইনের হইয়ার সিরি গ্রামে জাতিগত রাখাইন সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি অন্তত ১৭০ জন রোহিঙ্গা পুরুষ, নারী ও শিশুকে নির্বিচারে হত্যা করে। আহত বা নিহত হন আরও শত শত মানুষ। সংঘর্ষের মধ্যে পালিয়ে যাওয়ার সময় বেসামরিকদের লক্ষ্য করেই গুলি চালানো হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বাংলাদেশের কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবির

বাংলাদেশের কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরআসিয়ানের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থাটি বলছে, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে বাংলাদেশ ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।

কঠোর সামরিক সেন্সরশিপ এবং দুর্গম পরিস্থিতির কারণে এই গণহত্যার খবরটি ঘটনার এক বছরেরও বেশি সময় পর নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। জীবন বাঁচাতে সক্ষম হওয়া উদ্বাস্তুরা যখন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন এবং কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেন, তখন তাদের মুখ থেকে এই সত্য বেরিয়ে আসে। যেমন ওমর আহমদ নিজেই ২০২৫ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে পৌঁছাতে সক্ষম হন। এই ঘটনার দীর্ঘ দুই বছর পার হয়ে গেলেও আরাকান আর্মির রাজনৈতিক শাখা ইউনাইটেড লিগ অব আরাকান (ইউএলএ) বেসামরিক নাগরিক হত্যার দায় সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। উল্টো রাখাইন রাজ্যে থাকা অবস্থায় কিছু গ্রামবাসীকে জোরপূর্বক ভিডিও জবানবন্দি দিতে বাধ্য করা হয়েছে, যাতে তারা আরাকান আর্মিকে নির্দোষ দাবি করে।

তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ৪১ জন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষাৎকার, স্যাটেলাইট ছবি এবং সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে এই ঘটনার প্রমাণ সংগ্রহ করেছে। সংস্থাটির মতে, মিয়ানমার সেনাবাহিনী বেসামরিকদের সুরক্ষায় যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি। তবে সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ করেছে আরাকান আর্মি যাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, বেআইনি আটক ও নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছে, যা যুদ্ধাপরাধের শামিল। রাখাইন রাজ্যে সশস্ত্র সংঘাতের পটভূমি

২০০৯ সালে গঠিত আরাকান আর্মি মূলত রাখাইন জনগণের স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে লড়াই শুরু করে। ২০১৮ সালের শেষ দিক থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাদের তীব্র সংঘর্ষ চলছে। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে সংঘাত ভয়াবহ রূপ নেয়। এর মধ্যেই আরাকান আর্মি রাখাইনের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণে নিলে সেনাবাহিনীও পাল্টা হামলা বাড়ায়। ২০২৪ সালের এপ্রিল ও মে মাসে বুথিডং এলাকায় দুই পক্ষই বেসামরিকদের ওপর নির্যাতন চালায়। সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা যুবকদের জোরপূর্বক নিয়োগ দেয়, এমনকি অপ্রাপ্তবয়স্কদেরও। এতে রোহিঙ্গা ও রাখাইন সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ে। অন্যদিকে আরাকান আর্মিও একাধিক রোহিঙ্গা গ্রামে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিপন্ন হইয়ার সিরি গ্রাম

বুথিডং–রাথিডং সড়কের পাশে এবং মায়ু নদীর অববাহিকায় অবস্থিত হইয়ার সিরি গ্রামটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এর উত্তরে ছিল জান্তা বাহিনীর একটি সামরিক কমান্ড এবং দক্ষিণ-পূর্বে একটি লাইট ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়ন।

সংঘাতের সময় আশপাশের গ্রাম থেকে বাস্তুচ্যুত অনেক মানুষ এখানে আশ্রয় নেন। স্থানীয়দের মতে, আগে বিভিন্ন সহিংসতা থেকে কিছুটা নিরাপদ থাকায় গ্রামটি আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত ছিল। ফলে এপ্রিলের দিকে এখানে মানুষের চাপ অনেক বেড়ে যায়। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে সেনাবাহিনী গ্রাম থেকে ২০ জন ‘স্বেচ্ছাসেবক’ পাঠানোর চাপ দেয়, না হলে গ্রাম পোড়ানোর হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এর ফলে গ্রামবাসীরা কয়েকজন পুরুষকে পাঠাতে বাধ্য হন। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে কারণ সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মি—দুই পক্ষই গ্রামবাসীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল।

২ মে’র ভয়াবহ দিন

২ মে ভোরে আরাকান আর্মি ক্যাম্প দখলের পর জান্তা সেনারা উত্তর দিক থেকে গ্রামে প্রবেশ করে। এতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সকাল ৭টার দিকে হাজার হাজার মানুষ সাদা পতাকা হাতে বুথিডংয়ের দিকে রওনা হন।

মিছিলটি তৈনগা মুরা এলাকায় পৌঁছালে হঠাৎ গুলি শুরু হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, কোনো সতর্কতা ছাড়াই চারদিক থেকে গুলি চালানো হয়। এতে মুহূর্তেই বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়।

এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, চারপাশ থেকে গুলি আসছিল, কোথাও পালানোর সুযোগ ছিল না। আরেকজন বলেন, তার চোখের সামনে স্ত্রী ও সন্তানরা গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়।

অনেকে ধানক্ষেত ও মসজিদের দিকে আশ্রয় নিলেও সেখানেও হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। গুরুতর আহত অবস্থায় কয়েকজন লাশের নিচে লুকিয়ে বেঁচে যান।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১৭০ জনের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে, যার মধ্যে ৯০ জন শিশু। তবে স্থানীয়দের ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বেঁচে যাওয়া মানুষদের কষ্ট ও দাবি

হামলার পর বেঁচে থাকা মানুষগুলো বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। কিছু মানুষকে আরাকান আর্মি আটক করে টাকা ও মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরে তাদের অস্থায়ী ক্যাম্পে বন্দি করে রাখা হয়, যেখানে খাদ্য ও চিকিৎসার তীব্র সংকট চলছে।

স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, গ্রামটি পুরোপুরি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং এখন বসবাসের অযোগ্য। বর্তমানে অনেক রোহিঙ্গা মিয়ানমারের ভেতরে আটকে আছেন, আর কিছু বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। তারা আন্তর্জাতিক মহলে বিচার ও নিরাপত্তার দাবি জানাচ্ছেন।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে,  জান্তা সরকার ও আরাকান আর্মি উভয়ের পক্ষ থেকেই নির্যাতন অব্যাহত থাকায় বর্তমানে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের কোনও পরিবেশ নেই। আগামী ১৫ জুন থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের ৬২তম অধিবেশনে বিশ্বনেতাদের এই বিষয়টি জোরালোভাবে উত্থাপন করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি, যাতে এই যুদ্ধাপরাধের স্বাধীন তদন্ত এবং জড়িতদের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা যায়।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
২০২৬ © আজকের বসুন্ধরা কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
Theme Customization By NewsSun