ইতিহাস লিখেছেন বৈভব সূর্যবংশী। প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে আইপিএলের এক মৌসুমে ২০০–এর বেশি স্ট্রাইক রেটে ৫৫০–এর বেশি রান করেছেন ১৫ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার। গত বছরই নিজের প্রতিভার ঝলক দেখিয়েছিলেন এই কিশোর। রাজস্থান রয়্যালসের হয়ে ৭ ইনিংসে করেছিলেন ২৫২ রান, স্ট্রাইক রেট ছিল ২০৬। তবে এবারের আসরে তাঁর ব্যাটিং পৌঁছে গেছে সম্পূর্ণ অন্য এক উচ্চতায়। রানের পাহাড় আর স্ট্রাইক রেটের এমন বিধ্বংসী মেলবন্ধন ক্রিকেটের ইতিহাস আগে কখনো দেখেনি। চলতি মৌসুমে ২৩২.২৭ স্ট্রাইক রেটে রান তুলেছেন সূর্যবংশী। যেকোনো টি-টুয়েন্টি টুর্নামেন্টে ৫০০–এর বেশি রান করা যেকোনো ব্যাটসম্যানের চেয়ে এটি প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অভিষেক শর্মার (২০২৬ আইপিএলে ২০৬.২২ স্ট্রাইক রেটে ৫৬৩ রান)। শুধু রানের গতিই নয়, সূর্যবংশীর ছক্কার বৃষ্টি এবার এমন এক রেকর্ড ভাঙার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে, যা বয়সের দিক থেকে প্রায় তাঁর নিজের সমান পুরোনো। এবারের আইপিএলে সূর্যবংশীর কীর্তিগুলো ক্রিকেটভিত্তিক পোর্টাল এসপিএনক্রিকইনফোর সৌজন্যে তুলে ধরা হলো—
চলতি আইপিএলে ১৪ ম্যাচে সূর্যবংশী ছক্কা মেরেছেন ৫৩টি। আইপিএল বা যেকোনো টি-টুয়েন্টি টুর্নামেন্টের এক মৌসুমে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ছক্কার রেকর্ড। ২০১২ সালের আইপিএলে ক্রিস গেইলের মারা ৫৯টি ছক্কার রেকর্ডটি এখনো শীর্ষে রয়েছে। রাজস্থান রয়্যালস এলিমিনেটর ম্যাচে সানরাইজার্স হায়দরাবাদের মুখোমুখি হবে। ফলে গেইলের রেকর্ড ভাঙতে সূর্যবংশী অন্তত একটি ম্যাচ নিশ্চিতভাবেই পাচ্ছেন, আর দল ফাইনালে উঠলে ম্যাচ পাবেন তিনটি।

২০১২ সালের আইপিএলে ক্রিস গেইল এক মৌসুমে ৫৯টি ছক্কা মেরেছিলেনবিসিসিআই
টি-টুয়েন্টির ইতিহাসে সূর্যবংশীর আগে মাত্র দুজন ব্যাটসম্যান এক টুর্নামেন্টে ৫০ বা তার বেশি ছক্কা মারতে পেরেছিলেন। ২০১২ সালে ৫৯টি ছক্কার পর ২০১৩ আইপিএলে ৫১টি ছক্কা মেরেছিলেন ক্রিস গেইল। আর ২০১৯ সালের আইপিএলে আন্দ্রে রাসেল মেরেছিলেন ৫২টি ছক্কা।
সূর্যবংশীর ৫৩টি ছক্কার মধ্যে ৪২টিই এসেছে পেসারদের বলে, যা আইপিএলের এক মৌসুমে পেসের বিপক্ষে যেকোনো ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ ছক্কার রেকর্ড। গেইল ও রাসেল তাঁদের রেকর্ড গড়া মৌসুমে পেসারদের বিরুদ্ধে ৪০টি করে ছক্কা মেরেছিলেন।
সূর্যবংশী কি স্পিন খেলতে পারেন না? ঘটনা তা নয়। আসলে সূর্যবংশীর মারকুটে ব্যাটিংয়ের কারণে দলগুলো তাঁর সামনে স্পিনারদের আনতেই ভয় পেয়েছে। পুরো টুর্নামেন্টে স্পিনারদের মাত্র ৪৫টি বল খেলেছেন তিনি, তাতেই হাঁকিয়েছেন ১১টি ছক্কা। আর পেসারদের বিরুদ্ধে খেলা মাত্র ২০৩ বলে ২৩৮ স্ট্রাইক রেটে ৪২টি ছক্কা মেরেছেন এই বাঁহাতি।

বৈভব সূর্যবংশীর ছক্কা এখন ৫৩টিরাজস্থান রয়্যালস
লেংথ বল বোঝার অসাধারণ ক্ষমতার কারণে ফাস্ট বোলাররা সূর্যবংশীকে থামানোর কোনো পথই খুঁজে পাননি। গুড লেংথ ডেলিভারিতে তিনি ১৮৫.৭১ স্ট্রাইক রেটে রান তুলেছেন এবং এমন ৬৩টি বলে মেরেছেন ১০টি ছক্কা। তাঁকে থামাতে পেরেছে শুধু ইয়র্কার। পুরো টুর্নামেন্টে তিনি মাত্র ৯টি ইয়র্কার মোকাবিলা করে ৯ রান নিয়েছেন। ইয়র্কার দিতে গিয়ে বোলারদের মিস হওয়া ১৩টি ফুল টসে তিনি করেছেন মাত্র ৫ রান। তবে শর্ট এবং ফুলার লেংথের বল তাঁর সামনে গেলেই হয় বাউন্ডারি! এই দুই লেংথে তাঁর স্ট্রাইক রেট যথাক্রমে ৩৫৭.৫ ও ৩৪১.১৭! ব্যাক-অফ-দ্য-লেন্থ বলে তাঁর স্ট্রাইক রেট কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছে ২০০-তে। চলতি মৌসুমে তাঁর চারটি হাফ সেঞ্চুরির মধ্যে তিনটিই এসেছে মাত্র ১৫ বলে, আর অন্যটি করতে লেগেছে ২৩ বল। এর মধ্যে একটি ম্যাচে তিনি মাত্র ৩৬ বলে সেঞ্চুরি তুলে নেন, যা আইপিএলের ইতিহাসের তৃতীয় দ্রুততম সেঞ্চুরি।
ইনিংসের প্রথম বল থেকেই বোলারদের ওপর চড়াও হওয়া সূর্যবংশীর সহজাত বৈশিষ্ট্য। এই মৌসুমে যশপ্রীত বুমরা, লুঙ্গি এনগিডি ও মোহাম্মদ সিরাজের মতো বিশ্বসেরা বোলারদের ইনিংসের প্রথম বলেই ছক্কা মেরেছেন তিনি। তাঁর ৫৩টি ছক্কার মধ্যে ২০টি এসেছে ইনিংসের প্রথম ১০ বলের ভেতর, যার মধ্যে ১১টি মেরেছেন প্রথম ৫ বলের মধ্যেই। পাওয়ারপ্লের প্রথম ৬ ওভারেই তিনি মেরেছেন রেকর্ড ৩৭টি ছক্কা; আইপিএলের ইতিহাসে পাওয়ারপ্লেতে আর কোনো ব্যাটসম্যান ৩০টি ছক্কাও মারতে পারেননি। পাওয়ারপ্লেতে এক মৌসুমে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড গড়ার একদম কাছে আছেন এই কিশোর। ২০১৬ সালে ডেভিড ওয়ার্নার পাওয়ারপ্লেতে ৪৬৭ রান করেছিলেন, আর বৈভব ইতিমধ্যে করে ফেলেছেন ৪৩০ রান। শুধু পাওয়ারপ্লে নয়, মিডল ওভারেও সূর্যবংশী সমান বিধ্বংসী। পাওয়ারপ্লেতে প্রতি ৫.০৩ বলে তিনি একটি ছক্কা মেরেছেন। আর মিডল ওভারে তাঁর ছক্কা মারার গতি আরও বাড়ে—সেখানে ৬৫ বলে ১৬টি ছক্কা মেরেছেন (প্রতি ৪.০৬ বলে ১টি ছক্কা)। পাওয়ারপ্লেতে তাঁর স্ট্রাইক রেট যেখানে ২৩১.১৮, মিডল ওভারে তা আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩৫.৩৮-এ!
চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত ৪৪ জন বোলারের মুখোমুখি হয়ে ৩১ জনকেই ছক্কা মেরেছেন সূর্যবংশী। এর মধ্যে ৮ জন বোলারকে ছক্কা মেরেছেন তাঁদের করা প্রথম বলেই। সানরাইজার্স হায়দরাবাদের প্রফুল হিঙ্গে এবং সাকিব হুসাইন তাঁর সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছেন, দুজনের বলেই ৪টি করে ছক্কা মেরেছেন সূর্যবংশী। হায়দরাবাদের মাটিতে প্রথম দেখায় হিঙ্গে সূর্যবংশীকে প্রথম বলেই আউট করেন। ফিরতি ম্যাচে জয়পুরে প্রথম ওভারেই হিঙ্গেকে টানা ৪টি ছক্কা মারেন সূর্যবংশী।

সুনীল নারাইনের বলে খুব একটা ভালো খেলতে পারেননি সূর্যবংশীবিসিসিআই
চলতি মৌসুমে কমপক্ষে ৫টি বল করা বোলারদের মধ্যে মাত্র দুজনের বিরুদ্ধে সূর্যবংশীর স্ট্রাইক রেট ১৬০-এর নিচে ছিল। একজন লক্ষ্ণৌ সুপার জায়ান্টসের মহসিন খান, কলকাতার স্পিনার সুনীল নারাইন। মহসিনের বলে সূর্যবংশী আউট হয়েছেন দুবার। নারিনের ৮ বলে একটি ছক্কাসহ তিনি করতে পেরেছেন মাত্র ৭ রান। অথচ এই টুর্নামেন্টে কমপক্ষে ৫ বল খেলা ২৪ জন বোলারের মধ্যে ১৯ জনের বিপক্ষেই তাঁর স্ট্রাইক রেট ছিল ২০০-র ওপরে!
ছক্কা মারার জন্য বৈভবের সবচেয়ে পছন্দের জায়গা হলো লেগ সাইড। তাঁর ৫৩টি ছক্কার মধ্যে ৪২টিই এসেছে লেগ সাইডে। বিশেষ করে পুল শটে তিনি ওস্তাদ; এই শটে ২০টি ছক্কা মেরেছেন। ৩৬ বার পুল শট খেলে আউট হয়েছেন মাত্র একবার, আর এই শটে তাঁর স্ট্রাইক রেট ছিল ৪১৯.৪৪! তাঁর মোট ৫৮৩ রানের মধ্যে ৩৪৩ রানই এসেছে লেগ সাইড থেকে, যেখানে স্ট্রাইক রেট ছিল ৩০৬.২৫।