হাঁটতে শেখেনি মেয়েটি। ঘরজুড়ে হামাগুঁড়ি দিয়ে বেড়াত।
চোখের আড়াল হলেই দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে যেতেন মা। মেয়ের জন্মের আগে পোশাক কারখানার চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি। ইচ্ছা ছিল মেয়ে একটু বড় হলে আবারও চাকরি নেবেন। কিন্তু তার দেখাশোনা করতে গিয়ে চাকরি করার মতো সময় আর হয়ে ওঠেনি।
গত ১৭ মে থেকে ওই মায়ের অবসর মিলেছে। এখন আর ব্যস্ত থাকতে হবে না তাকে। কারণ হামের লক্ষণ নিয়ে মারা গেছে ছোট্ট শিশুকন্যাটি।
ময়মনসিংহের ভালুকা পৌর শহরের কলেজ এলাকায় বসবাস করা দরিদ্র এক পরিবারের গল্প এটি।
মায়ের নাম হ্যাপি আক্তার। আট মাস বয়সী মেয়ে ইশরাতকে হারিয়ে শোকে কাতর তিনি। বাবা শাহ আলম ভাঙারির ব্যবসা করেন। মেয়েকে নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন ছিল।
আর এক দিন পরই ঈদ। প্রসঙ্গটি উঠলেই হ্যাপি আক্তার দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলেন, ‘আমার আরো দুটি মেয়ে আছে। তাদের দিকে তাকিয়ে আমি স্বাভাবিকভাবে দিন কাটানোর চেষ্টা করছি। তবু ভেতরে ভেতরে খুব কষ্ট হয়। আমরা সবাই আছি। কিন্তু সবার ছোট মেয়েটা নেই। আর কোনো দিন আসবে না সে। তবু দুই মেয়ের জন্য ঈদ পালন করতে হবে। ঈদের দিন সারা দিনই মেয়েটার কথাই মনে হবে।’
হ্যাপি আক্তার জানান, তিন মেয়ের মধ্যে দ্বিতীয় মেয়ের বয়স চার বছর। ইশরাতের বয়স ছিল আট মাস। হামের বিশেষ টিকাদান শুরু হলে দুজনকেই টিকা দেওয়া হয়েছে। তবু হামে আক্রান্ত হয় শিশুটি।
ময়মনসিংহে হামে মারা যাওয়া আরেক শিশু তাজনিন। গত ৩ মে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মারা যায় শিশুটি। ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার দত্তগ্রামে তাজনিনের বাড়িতে এখনো শোকের ছায়া। মা হেলেনা আক্তার মেয়ের শোকে সারা দিন কান্নাকাটি করেন। কোনো মানুষের সঙ্গে তিনি কথা বলেন না এখনো।
তাজনিনের বাবা ইসলাম উদ্দিন বলেন, ‘আমার পাঁচ সন্তানের মধ্যে তাজনিন সবার ছোট। একটু বেশিই আদরের ছিল সে। তার জন্য মনটা খুব কাঁদে।’ তিনি বলেন, গত রোজার ঈদের কয়েক দিন আগে থেকেই মেয়েটার জ্বর জ্বর ভাব ছিল। পরে হামের লক্ষণ দেখা দিলে তাকে ময়মনসিংহ হাসপাতালে ভর্তি করি।’
গত মার্চ মাস থেকে সারা দেশের মতো ময়মনসিংহ ও এর আশপাশের জেলাগুলোতে হামের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। এ পর্যন্ত ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মারা গেছে ৩৯টি শিশু। তারা ময়মনসিংহ ও এর আশপাশের শেরপুর, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, জামালপুর ও গাজীপুর জেলার।
ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত ১৭ মার্চ থেকে হামের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি হওয়া শিশুদের চিকিৎসার জন্য বিশেষ আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। এ পর্যন্ত এক হাজার ৬০৯টি শিশু ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে এক হাজার ৫০৮ জন শিশু সুস্থ হলেও মারা গেছে ৩৯ জন।
ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে হাম আক্রান্ত শিশুদের দায়িত্বে থাকা ডা. গোলাম মাওলা বলেন, শিশুদের চিকিৎসায় আমরা অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। নতুন করে শিশুদের টিকার আওতায় এনেছে সরকার।