অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা শরীয়তপুর সদর উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল গঙ্গানগর গ্রামের এক সাধারণ পরিবারের মেয়ে সায়েম আক্তার। পিতার আর্থিক টানাপোড়েনের কারণে সায়মার ১৪ বছর বয়সেই বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের পর স্বামীর সংসার সামাল দিয়ে নিজের অদম্য স্পৃহা ও কঠিন সাধনায় তিনি গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেন।
পড়াশোনা শেষ করে চাকরির জন্য দীর্ঘদিন দ্বারে দ্বারে ঘুরে ব্যর্থ হয়ে আশা ছেড়ে দেন চাকরির। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখা সায়মা তার জীবনের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে স্বেচ্ছাসেবী বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন এসডিএস এর রেইজ প্রোগ্রাম থেকে বিউটিফিকেশন ট্রেন্ডে ট্রেনিং নেন। ট্রেনিং শেষে একটি পার্লারে সামান্য বেতনে চাকরি নিলেও এতে তার জীবন চলছিলনা।
সায়মার স্বামী দেলোয়ার শাহ্ ডিলারশীপ ব্যাবসার মাধ্যমে সুপ্রতিষ্ঠিত ছিলেন। এরই মধ্যে হঠাৎ করে তার ব্যবসায় ধস নামে। এ সময়ে তিনি ২০ লাখ টাকা ঋণী হয়ে পড়েন। স্বামী সংসার নিয়ে সায়মা কঠিন বিপদের সম্মুখীন হন।
এ পরিস্থিতিতে সায়মা চাকরি ছেড়ে দিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ে নিজ উদ্যোগে বাড়ি সংলগ্ন গঙ্গোনগর বাজারে ‘সাজঘর মেকওভার’ নামে একটি বিউটি পার্লার খুলে ব্যবসা শুরু করেন। নিজের জমানো সামান্য পুঁজিতেই শুরু হয় তার প্রথম পথ চলা।
পরবর্তীতে স্বেচ্ছাসেবী বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন এসডিএস-এর রেইজ প্রকল্প থেকে ৬০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ব্যবসা আরও সম্প্রসারণ করেন। প্রথম দিকে অনেক চ্যালেঞ্জসহ বিভিন্ন বাঁধা মোকাবেলা করতে হয়েছে সায়মার। কিন্তু কোন বাঁধাই সায়মার পথ চলায় আটকাতে পারেনি।
অদম্য নারী উদ্যোক্তা সায়মা কঠোর পরিশ্রম, প্রচন্ড মনোবল আর অসীম ধৈর্য্য ও সবার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে একাগ্র চিত্তে ব্যবসা পরিচালনা করে সফলতার দুয়ার উন্মোচন করেন।
বিউটিফিকেশন ব্যবসার মাধ্যমে সায়মা আক্তার এখন সফল নারী উদ্যোক্তা। তার পার্লারে নিয়মিত ৫ জন কর্মচারী কাজ করেন। কর্মচারীদের বেতন, ঘরভাড়াসহ অন্যান্য সকল খরচ মিটিয়ে সায়মার মাসিক আয় এখন ৪০ হাজার টাকার ঊর্ধ্বে। সফল নারী সায়মা আক্তারের রয়েছে দুটি ছেলে সন্তান।
সায়মা শুধু নিজেই প্রতিষ্ঠিত নন, ব্যবসার আয় দিয়ে স্বামী দেলোয়ার শাহ্কেও প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সায়মার সহযোগিতায় দোলোয়ার এখন ৪টি আম বাগানের মালিক। প্রতিটি বাগানে ল্যাংড়া, বারি-৪, ও হাঁড়িভাঙ্গা জাতের আমগাছ রয়েছে। এ আমবাগান থেকে বছরে ৪০ লাখ টাকা আয় হয় তাদের।
সায়মার সঙ্গে আলাপকালে জানান, নিজে বিয়ের পর কষ্ট করে লেখাপড়া না শিখলে এতদূর আসা সম্ভব হতনা। তাই সে ছেলে দুটিকে সর্বোচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে চান। সায়মার ছেলেরা প্রাইমারি পর্যায়ে পড়াশোনা করছে।
সায়মা আক্তারের সবচেয়ে বড় অবদান সামাজিক দায়বদ্ধতা। তিনি বুঝতে পারেন যে, গ্রামের অনেক নারী রয়েছেন যারা বেকার, অথচ কিছু শেখার সুযোগ পেলে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবেন। তাদের কথা ভেবে সে নিজের পার্লারে দুইজন করে বেকার নারীকে দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছেন। যারা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, তারা এরই মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় চাকরি নিয়ে স্বাবলম্বী হবার পথ খুঁজে নিয়েছেন।
সায়মা কেবল একজন সফল নারী উদ্যোক্তাই নয়, বরং সে নিজের গ্রামের নারীদের আর্থিক ক্ষমতায়নের পথ তৈরি করা এক সফল নারী রোল মডেল। তিনি প্রমাণ করেছেন, প্রশিক্ষণ, আত্মবিশ্বাস, চেষ্টা আর ইচ্ছে থাকলে সব বাঁধা উপেক্ষা করে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব।
এরইমধ্যে বিউটি পার্লারের ব্যবসা করে সায়মা তার নিজ এলাকায় ৪০ শতাংশ কৃষি জমি ক্রয় করেছেন। বিউটি পার্লার ব্যবসায় পাশাপাশি সে একটি খাবার হোটেল খোলার উদ্যোগে নিয়েছেন। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। এখানে এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সে বিপুল সংখ্যক নারীর কর্মসংস্থান করবেন বলে জানান।
সায়মা কাছে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বর্ণা আক্তার বলেন, আগে আমি বেকার ছিলাম। সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরাতো। খুব কষ্টে পরিবারের সবাইকে নিয়ে জীবর যাপন করতে হতো। সায়মা আপার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আমি এখন স্বাবলম্বী।
এ প্রসঙ্গে জাজিরা বাজারের হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক আনোয়ার হোসেন বলেন, সায়মা খুব কষ্ট করে এ পর্যায়ে এসেছে। অনেকেই বিউটি পার্লার ব্যবসা করেন, কিন্তু কেউ সায়মার পর্যায়ে আসতে পারেনি। সে সততার সাথে একাগ্রভাবে দিনরাত পরিশ্রম করে আজ স্বাবলম্বী। আমরা তাকে নিয়ে গর্বিত।
গঙ্গানগর বাজারের মুদি ব্যবসায়ী আবুবকর সিদ্দিক বলেন, সায়মা আমাদের অনুপ্রেরণা। তৃণমূল পর্যায় থেকে সায়মা উঠে এসেছে। তার কর্মদক্ষতা তাকে এ হতদরিদ্র অবস্থা থেকে একজন সফল উদ্যোক্তায় পরিণত করেছে। তার কাছে অনেক বেকার নারী প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে চলছে। সে নিজে কাজ করে ও অন্যকে কাজ শেখায় ।
সায়মা আক্তার বাসসকে বলেন, ‘দুঃখ দুর্দশার মাঝে থেকেও আমি কখনোই নিজেকে অসহায় ভাবিনি। আমার আত্মবিশ্বাস আমাকে আজকের এ সফলতা এনে দিয়েছে। আমি নিজে কাজ করি, কাজ শিখাই। বিউটিফিকেশন ব্যবসাকে আমি মেয়েদের মাঝে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে চাই’।
সায়মাকে ঋণদান ও প্রশিক্ষণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এসডিএস এর রেইজ প্রজেক্টের সমন্বয়কারী আবু আসলাম বাসসকে বলেন, ‘আমরা উদ্যোক্তা সালমাকে প্রশিক্ষণসহ টেকনিক্যাল সাপোর্ট ও প্রাথমিকভাবে ৬০ হাজার টাকা ঋণ দিয়েছি। বিউটিফিকেশন ব্যবসা করে তিনি যথাযথভাবে ঋণ পরিশোধ করেছেন। সালমা স্বাবলম্বী হওয়ায় আমরা গর্বিত।