জন্ম থেকেই দুই পা স্বাভাবিক তুলনায় ছোট, দুই হাতের উপর ভর করে হামাগুড়ি দিয়ে চলতে হয় তাকে—এমন শারীরিক প্রতিবন্ধিতা নিয়েই দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রাম করছেন কদম আলী (২৭)। তবে কখনো হাল ছাড়েননি, ভিক্ষা করেননি, অন্যের কাছে হাত পাতেননি। নিজের শ্রমেই সংসার চালিয়ে এসেছেন তিনি। এখন কাজের ভারে শারীরিক অসুস্থতাও বাড়ছে তবুও হাল ছাড়েননি।
কদম আলীর বাড়ি সিরাজগঞ্জ জেলার কাজীপুর উপজেলার নাটুয়ারপাড়া পানাগাড়ী এলাকায়। জীবিকার তাগিদে গাজীপুরের কোনাবাড়ী জরুন দশতলা গার্মেন্টস গেইট সংলগ্ন এলাকায় ছোট্ট একটি দোকান ভাড়া নিয়ে চায়ের দোকান পরিচালনা করেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, কদম আলীর দোকানে আছে বিস্কুট, চানাচুর, বাদাম, সিগারেট এবং চা, পণ্যের পরিমাণ বেশি নয়। পাশেই পোশাক কারখানা হওয়ায় শ্রমিকরা সেখানে চা খাচ্ছেন।
দৈনিক বসুন্ধরা প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপে কদম আলী জানান, তিনি জন্ম থেকেই প্রতিবন্ধী। মাত্র ১২ বছর বয়সে তার বাবা মারা যান। তারা চার ভাই দুই বোন, কদম আলী চার ভাইয়ের ছোট এবং দুই বোনের বড়। তবে তাঁরা সবাই কর্ম করেই জীবন চালান। কদম আলীর কোনো জায়গাজমি না থাকায় দোকানের পাশে একটি ভাড়া বাড়িতে বসবাস করেন। সঙ্গে থাকে তাঁর ছোট বোন এবং বোনের স্বামী। তারাও চাকরি করেন পাশের একটি পোশাক কারখানায়।
প্রতিবন্ধিতাকে কখনোই বেঁচে থাকাতে বাধা মনে করেননি জানিয়ে কদম আলী বলেন, শারীরের এ অবস্থার কারণে তেমন কঠিন কোনো কাজ করতে পারি না। তবে বসেও থাকিনা বাঁচতে হলে যেহেতু খাইতে হবে তাই কর্ম করেই খাই। ৮ বছর হলো এহেনে দোকানদারি করছি।
কদম আলী বলেন, এহেনে ভালোই লোকজন আয়ে। বেচাকিনা খারাপ হয় না। কিন্তু আমার দোকানে তো মালই নাই। মাল না থাকলে কী বেচব। টাকার অভাবে মাল উঠাতি পারিনে। দিনে যা বেচাকিনা হয় তার থেকে ১৫০ থেকে ২০০ টাকার মতো লাভ থাকে। এ দিয়ে ঘর ভাড়া, সংসার, ওষুধ ও বাড়িতে বৃদ্ধা মায়ের খরচ চালাতে খুব কষ্ট হয়।
জীবনের প্রতি তাঁর কোনো অভিযোগ নেই। কদম বলেন, হয়তো অর্থসম্পদ থাকলে ঘরদুয়ার করে বৃদ্ধা মা আর ভাই বোনদের নিয়ে সুখে থাকতে পারতাম। কিন্তু তা তো নাই৷ দুই-চার হাজার পুঁজি আছে, তাই দিয়ে বেচাকিনা করি। কোনরহম খায়ে না খায়ে চলতি হয়। তারপরও বলব, ওপর আল্লাহর ইচ্ছায় ভালো আছি। যদি মালামাল উঠাতে পারতাম, তাইলে বেচাকেনা আরেকটু ভালো করতে পারতাম।
জরুন এলাকার বাসিন্দা রবিউল ইসলাম এবং পোশাক শ্রমিক সোহেল, মামুন, হাসান, খালিদ ও শামীমসহ কয়েকজন বলেন, কদম ভিক্ষা না করে পরিশ্রম করে সংসার চালান। সরকার ও বিত্তবানদের উচিত তাঁকে একটি দোকানঘর ও মূলধন দিয়ে সহায়তা করা। এতে তিনি আত্মসম্মানের সঙ্গে আরও ভালোভাবে জীবন যাপন করতে পারবেন।
শহর সমাজসেবা কার্যালয় গাজীপুর সমাজসেবা অফিসার মোঃ জাকির হোসেন দৈনিক আজকের বসুন্ধরাকে বলেন, প্রতিবন্ধী হয়েও কদম আলী পরিশ্রম করে সংসার চালান, এটি প্রশংসনীয়। যে এলাকার ভোটার সেখানে যোগাযোগ করলে ব্যবসার জন্য সুদমুক্ত ঋণসহ সরকারি সহযোগিতার যেকোনো সুযোগ থাকলে উনি পেয়ে থাকবেন এবং তাতে আরও স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারবেন।