জন্ম থেকেই দুটি হাত নেই। মাত্র দুই ফুট উচ্চতার শরীর, বয়স ৪৫ হলেও শারীরিক গঠন অনেকটা শিশুর মতো। প্রতিকূলতা যেন জন্মের পর থেকেই সঙ্গী। তারপরও জীবনযুদ্ধ থেকে একদিনের জন্যও পিছিয়ে যাননি শারীরিক প্রতিবন্ধী ভানু আক্তার।
স্বামী-সংসার, স্বপ্নভঙ্গ, দারিদ্র্য আর সংগ্রামের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এখন তিনি লড়ছেন নিজের অস্তিত্ব আর ১২ বছরের ছেলে সন্তানকে মানুষ করার স্বপ্ন নিয়ে। দুই হাত না থাকলেও দুই পা দিয়েই রান্নাবান্না থেকে শুরু করে কাপড় ধোয়া, ঘর পরিষ্কার, এমনকি দোকান পরিচালনাসহ দৈনন্দিন সব কাজ নিজেই করেন তিনি। শারীরিক প্রতিবন্ধী ভানু আক্তার নীলফামারীর ডিমলা থানার ছাতনাই বালাপাড়া এলাকার আব্দুস সাত্তারের মেয়ে।
একই এলাকার বাসিন্দা খোরশেদ আলমের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে ভানু আক্তারের। পরে ভালোবেসে বিয়ে করেন তারা। পরিবারের অমতে হওয়া সেই বিয়ে দুই পরিবারের কেউই মেনে নেয়নি। পরে ২০১০ সালে স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে নতুন জীবনের স্বপ্নে তারা পাড়ি জমান গাজীপুরে।
সেই থেকে গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ী দক্ষিণ হরিণাচালা এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করেন তারা। সংসারের হাল ধরতে একটি ঝুট গুদামে মাত্র ৫০ টাকা দিন হাজিরার কাজও করেন ভানু। নিজের উপার্জনের টাকায় স্বামীর পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন দীর্ঘদিন। ভানুর মানবেতর জীবনযাপন আর স্বামী খোরশেদ আলমের ভবিষ্যতের কথা ভেবে কোন এক সহযোগিতায় খোরশেদের চাকরি হয় সচিবালয়ে। কিন্তু চাকরি পাওয়ার পর একসময় স্ত্রীকে ছেড়ে চলে যান তিনি।
বিচ্ছেদের মধ্য দিয়ে থেমে যায় ভানুর সাজানো সংসারের স্বপ্ন। তবে জীবনযুদ্ধের কাছে হার মানতে রাজি নন ভানু। অন্যের কাছে হাত না পেতে নিজের শ্রম আর ইচ্ছাশক্তিকে পুঁজি করেই দাঁড়িয়ে থাকতে চান তিনি।
বর্তমানে কোনাবাড়ী দক্ষিণ হরিণাচালা এলাকায় একটি ছোট্ট দোকান পরিচালনা করছেন ভানু। তার দোকানে রয়েছে পান, সিগারেট, বিস্কুট, চানাচুর, বাদাম এবং বাচ্চাদের জন্য চিপস। পাশাপাশি পা দিয়ে তৈরি করেন পুঁতির মালা, ব্যাগ, হাতপাখাসহ বিভিন্ন সামগ্রী। কিন্তু বাজারে এসব পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় আয়ও কমে এসেছে অনেক।
ভোর হওয়ার আগেই শুরু হয় তার দিন। সংসারের কাজ শেষ করে ছুটে যান দোকানে। ছোট্ট ছেলে কে মাদ্রাসায় পড়াশোনা করাচ্ছেন তিনি। তবে দোকানে পর্যাপ্ত পণ্য না থাকায় বিক্রি কমে গেছে, ফলে সংসারের খরচ চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
দক্ষিণ হরিণাচালা এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা মমিন বলেন, ভানুর দুই হাত নেই, কিন্তু দুই পা দিয়েই তিনি সব কাজ করেন। নিজের হাতে নয়, পায়ের সাহায্যে পুঁতির মালা, ব্যাগসহ নানা জিনিস তৈরি করেন। বর্তমানে বিক্রি কমে যাওয়ায় তিনি খুব কষ্টে দিন পার করছেন। দোকানে সিগারেট কিনতে আসা কাস্টমার আসাদুল বলেন, ভানুর আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ। সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি কিংবা সরকারি কোনো সহযোগিতা পেলে তিনি আরও ভালোভাবে জীবনযাপন করতে পারতেন।
ভানু আক্তার বলেন, আমি প্রতিবন্ধী, কিন্তু স্বপ্ন দেখা বন্ধ করিনি। আমার বিশ্বাস, স্বপ্ন দেখা কোনো অপরাধ নয়, স্বপ্ন ছেড়ে দেওয়াটাই আসল পরাজয়। ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে সংসার চালাতে খুব কষ্ট হচ্ছে। কারও কাছে হাত পাতবো না ভেবেই এই ছোট দোকান করেছি। যদি কেউ দোকানের জন্য কিছু পণ্য বা পুঁজি দিয়ে সহযোগিতা করতো, তাহলে হয়তো আরও ভালোভাবে বাঁচতে পারতাম।
দুই হাত নেই, আছে শুধু অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর বেঁচে থাকার লড়াই। প্রতিদিনের সংগ্রামের মধ্যেও নিজের ও সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখেন ভানু। সমাজ ও রাষ্ট্রের সামান্য সহায়তা হয়তো বদলে দিতে পারে এই সংগ্রামী নারীর জীবনের গল্প।