কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক দম্পতির একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে আইফোন ছিনতাইয়ের জন্য অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ও নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িত থাকার দায়ে তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অপ্রতিম ছিল বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম ও কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র ছেলে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে অপ্রতিম বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে মায়ের আইফোনটি নিয়ে বাসা থেকে বের হয়। এরপর থেকে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। সন্ধ্যা সোয়া ৬টা পর্যন্ত গন্ধমতী এলাকায় তার ফোনের অবস্থান শনাক্ত হলেও পরে আর কোনো সিগন্যাল পাওয়া যায়নি। নিখোঁজের প্রায় ২১ ঘণ্টা পর শনিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী লালমাই সানন্দা পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্তে তার মাথায় গুরুতর আঘাত ও শরীরে জখমের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
তদন্তকারী পুলিশ জানায়, অভিযুক্তরা আইফোন হাতিয়ে নেয়ার লোভে অপ্রতিমকে নির্জন পাহাড়ি এলাকায় ডেকে নেয়। সেখানে আইফোনটি দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। এরপর তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল বাঁশের শক্ত লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে। পরে ফোনটি নিয়ে তারা পালিয়ে যায়। সিসিটিভি ফুটেজ ও তুহিনকে আটকের পর তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে তার বাড়ির তোষকের নিচ থেকে ছিনতাই করা আইফোনটি উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনায় সিয়াম নামে আরও একজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয়া হয়েছে।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর কোটবাড়ি-সালমানপুর এলাকার কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য ও নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় কিশোরদের বিভিন্ন গ্রুপের আধিপত্য থাকলেও প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। পূর্বে তুহিনের বিরুদ্ধে মোটরসাইকেল চুরিসহ নেশার অভিযোগ থাকলেও কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেয়ায় অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুক্তভোগীরা বলছেন, ছোট অপরাধে ছাড় পাওয়ার ফলেই তারা বড় অপরাধ করার সাহস পাচ্ছে।
অপ্রতিমের অকাল মৃত্যুতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ স্থানীয়রা গভীরভাবে শোকাহত। বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীরা মহাসড়ক অবরোধ করে দ্রুত বিচার দাবি করেছেন। কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. শরীফুল করিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
নিহত অপ্রতিমের প্রথম জানাজা রোববার সকাল ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে গন্ধমতী ঈদগাহ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। জানাজার সময় অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার কান্নাজড়িত কণ্ঠে তার সন্তানের জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন এবং সমাজের মানুষের ভালোবাসা ও ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন।
ঘটনার তদন্ত ও বিচারের বিষয়ে কুমিল্লা জেলার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, মামলার রহস্য উন্মোচিত হয়েছে এবং চার্জশিট বা প্রতিবেদন দ্রুত আদালতে জমা দেয়া হবে। পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি উল্লেখ করেন, রামিসা হত্যাকাণ্ডের মতো এই মামলাটির ক্ষেত্রেও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জন্য বিজ্ঞ আদালতের কাছে বিশেষ আবেদন জানানো হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা, খুনিরা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দেশ জুড়ে আলোচিত ঘটনা শিশু অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আইফোনটি দিতে রাজি হয়নি ১৩ বছরের অপ্রতিম। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পাহাড়ঘেরা নির্জন বনের মধ্যে তাকে ঘিরে ধরে তিন তরুণ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গ্রেপ্তার তুহিনের স্বীকারোক্তির বরাতে পুলিশ বলছে, আইফোন ছিনিয়ে নিতেই পরিকল্পনা করে অপ্রতিমকে নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করছেন, এসব গ্যাংয়ের সদস্যদের পেছনে প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয় রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত তার মুঠোফোনের অবস্থান গন্ধমতী এলাকায় শনাক্ত হলেও এরপর ফোনটির আর কোনো অবস্থান পাওয়া যায়নি।