1. admin@ajkerbasundhara.com : admin :
মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৩৩ অপরাহ্ন

সৌদি-হুথি সংঘাত: শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্স নিয়ে গভীর উদ্বেগে বাংলাদেশ

স্টাফ রিপোর্টার
  • প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে গত ছয় মাস ধরে চলমান অস্থিরতা এখন এক নতুন ও উদ্বেগজনক মোড় নিয়েছে। ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি আরবের সরাসরি সংঘাত তীব্র হওয়ায় পুরো অঞ্চলে নতুন করে সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। ইয়েমেনে সৌদি বাহিনীর বিমান হামলার বিপরীতে সৌদি ভূখণ্ডে একের পর এক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে হুথিরা। বাব এল-মান্দেব প্রণালিসহ লোহিত সাগরের কৌশলগত পয়েন্টগুলোতে হুথিদের তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় আঞ্চলিক নিরাপত্তার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ঝুঁকিও কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।

সৌদি আরব বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার এবং রেমিট্যান্স অর্জনের প্রধান উৎস। বর্তমানে দেশটিতে ৪০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশী কর্মরত রয়েছেন। ২০২৫ সালেই নতুন করে ৭ লাখ ৫৫ হাজার ১৯৪ জন বাংলাদেশী কাজের সন্ধানে দেশটিতে পাড়ি জমিয়েছেন, যা ওই বছর বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়া মোট কর্মীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। এ ছাড়া চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ২ লাখ ৭৬ হাজার ৮৭৭ জন সৌদি আরব গিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটি থেকে ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছরের জুলাই মাসেই সৌদি আরব থেকে এসেছে ৫৮ কোটি ৭৩ লাখ ডলার রেমিট্যান্স।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সংকুচিত হতে পারে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলে শিল্প ও সেবা খাতে শ্রমের চাহিদা হ্রাস পাবে। কভিডের সময়ের মতো পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটলে অনেক প্রবাসীকে কর্মহীন হয়ে দেশে ফিরে আসতে হতে পারে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, সৌদি আরবের উন্নয়ন প্রকল্পের গতি কমে গেলে বা নতুন কর্মী নিয়োগ স্থগিত হলে তা সরাসরি বাংলাদেশের রেমিট্যান্স আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের শহরগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখন অত্যন্ত নাজুক। গত ১৪ সেপ্টেম্বর নাজরান, খামিস মুশাইত, জিজান ও আবহায় জরুরি সতর্কতা জারি করে দেশটির সিভিল ডিফেন্স। হামলা হয়েছে আবহা ও নাজরানের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে, যেখানে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী কৃষি ও ছোট ব্যবসার সাথে যুক্ত। মক্কা, জেদ্দা ও তায়েফের মতো পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ শহরেও নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। মক্কায় ড্রোন ধ্বংসের ঘটনার পর সেখানে অবস্থানরত প্রবাসীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। যদিও হুথিরা মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে, তবে সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি সাধারণ প্রবাসীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

জ্বালানি নিরাপত্তা বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় দুশ্চিন্তার কারণ। দেশের বার্ষিক জ্বালানি চাহিদার বড় অংশই আমদানিনির্ভর, যার প্রধান উৎস সৌদি আরব। আরামকোর ‘অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড’ আমদানির ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ। চলমান সংঘাতের কারণে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ইউরোপে তেল সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং বেশ কিছু কার্গো বাতিল করা হয়েছে। বাব এল-মান্দেব ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়কে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।

সৌদি আরব নিজেও যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট মাসে দেশটির অপরিশোধিত তেল উৎপাদন কমে ৬২ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে, যা তিন দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। জেদ্দায় ইলেকট্রনিক পণ্যের ব্যবসায়ী প্রবাসী নুরুল আফসার জানান, কভিডের ধকল কাটতে না কাটতেই নতুন এ যুদ্ধের অস্থিরতায় ব্যবসায়ীরা নতুন করে চাপের মুখে পড়েছেন। দোকানপাটে গ্রাহক সমাগম কমে যাওয়ায় ব্যবসায়িক মন্দার ভয় বাড়ছে।

দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও এই অস্থিরতা প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সৌদি সরকারের ডেটাসৌদির তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে সৌদি আরবের রফতানি ছিল ১৪০ কোটি ডলারের, আর বাংলাদেশ থেকে ৪৫ দশমিক ৮ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে। সরকার সৌদি আরবের সাথে বড় ধরনের বিনিয়োগ চুক্তির চেষ্টা করছে, যার অংশ হিসেবে বন্দর নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আলোচনা চলছে। তবে যুদ্ধের কারণে সৌদি আরব তার বাজেটে ব্যয় অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাস করতে বাধ্য হলে এই বিনিয়োগ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কেজ বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক ও ফ্রান্সভিত্তিক জিওপলিটিক্স স্ট্র্যাটেজি ল্যাবের প্রধান ড. সাজ্জাদ মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন সতর্ক করেছেন যে, সংঘাত আরো বড় রূপ নিতে যাচ্ছে। সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরের মতে, সৌদি আরবে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত হলে শুধুমাত্র রেমিট্যান্স নয়, বরং ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশী পণ্য রফতানির চেইনও বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের শ্রম ও জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা এখন সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির ওপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত ও পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে এবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ইয়েমেন ফ্রন্ট। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আর তাতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ তৈরি হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিশেষ করে বিদেশী শ্রমিকদের কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। চাকরির আরও তথ্য: ফলে অনেকে চাকরি হারিয়ে দেশে ফেরত এলে শ্রমবাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পরদিন মক্কা, জেদ্দা ও তায়েফেও বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে নিরাপদ থাকতে বলা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মক্কায় হামলার চেষ্টাকে ‘রেড লাইন’ বলে উল্লেখ করেছে সৌদি আরব।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
২০২৬ © আজকের বসুন্ধরা কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
Theme Customization By NewsSun