জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে পাঁচ দিনের সফর সম্পন্ন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকার গঠনের পর আন্তর্জাতিক এই মঞ্চে এটি ছিল তার প্রথম অংশগ্রহণ, যা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে বিশেষ আগ্রহ ছিল। সফরকালে তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়ার পাশাপাশি ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যসহ মোট ৩০টি আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে সময়ের কার্যকর ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সব ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। নিউইয়র্কে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, সফরকালে প্রধানমন্ত্রী ১১টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন। এ ছাড়া কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপপ্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। এর বাইরে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘের মহাসচিব, মিয়ানমার-বিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত, জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার হাইকমিশনার এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক হাইকমিশনারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের কথা জানিয়েছেন মাহদী।
সফর চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করার সময়েই মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ ১১টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। তবে এই বিশেষ চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের মূল কার্যক্রমে প্রধানমন্ত্রী নিজে উপস্থিত ছিলেন না। এদিকে, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে পাঁচ দফা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেশ করেছেন। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, দীর্ঘস্থায়ী এই রোহিঙ্গা সংকট কেবল বাংলাদেশের জন্য নয়, বরং পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় ধরনের হুমকি বা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব এবং করণীয় নিয়েও তিনি খোলামেলা আলোচনা করেছেন। সফরের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারকও সই হয়েছে।
সাবেক কূটনীতিকরা প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরের মতে, সরকার প্রধান হিসেবে নিজের প্রথম এই সফরে প্রধানমন্ত্রী অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক সম্প্রদায়—উভয়কেই লক্ষ্য করে ভারসাম্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বড় ধরনের বৈশ্বিক কূটনৈতিক সফর ছিল। তবে সাবেক এই রাষ্ট্রদূত এও যোগ করেন যে, সফরের প্রাপ্তি ও লক্ষ্য অর্জনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব মূল্যায়ন জানতে পারলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হতো, যদি তিনি নিজে সরাসরি কোনো সংবাদ সম্মেলন করতেন।
অন্যদিকে, সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ও সমসাময়িক বিষয়গুলো চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। বাংলাদেশের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট তুলে ধরার পাশাপাশি বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে দেশটি কী ধরনের সহযোগিতা প্রত্যাশা করে, সে বিষয়টিও তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে হওয়া আলোচনার বিষয়গুলোও এই সফরে গুরুত্ব পেয়েছে। বিবিসি’র তথ্য অনুযায়ী, সব মিলিয়ে তারেক রহমানের এই পাঁচ দিনের সফরটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জোরদার করার ক্ষেত্রে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সফরে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট, স্বাস্থ্য, জলবায়ু ও আন্তর্জাতিক শান্তিসহ বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। রোহিঙ্গা ও জলবায়ু ইস্যুতে গুরুত্ব সফরে রোহিঙ্গা সংকট ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। ‘রোহিঙ্গা সংকট: দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির অবসানে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিসহ টেকসই সমাধানের আহ্বান’ শীর্ষক একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক যৌথভাবে।