সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ার ধারাবাহিকতায় প্রিন্ট মিডিয়ার পর এবার ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটি। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে আয়োজিত এই চতুর্থ বৈঠকে টেলিভিশন ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমের প্রধান নির্বাহী, সম্পাদক, হেড অব নিউজ এবং বিশিষ্ট টকশো ব্যক্তিত্বরা অংশ নেন। সভায় কমিটির পক্ষ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির একটি গ্রহণযোগ্য রূপরেখা তৈরির জন্য মুক্ত প্রস্তাব আহ্বান করা হয়েছে। বৈঠক শেষে সংসদের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কমিটির চেয়ারম্যান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং মিডিয়া প্রতিনিধিরা এ তথ্য জানান। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন বিষয়ক বিশেষ কমিটির চতুর্থ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পাওয়া প্রস্তাবগুলোর মধ্যে জাতির জন্য সবচেয়ে উপযুক্তটিকে বিবেচনায় নিয়ে জাতীয় সংসদে পর্যালোচনার পর আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, গত রোববার ও মঙ্গলবার দুই দিনে গণমাধ্যমের সম্পাদক, টিভি চ্যানেল ও অনলাইন পোর্টালের বার্তা ব্যবস্থাপক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব এবং সাংবাদিক নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় থেকে গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্তর প্রস্তাব পাওয়া গেছে। বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা টেকসই গণতন্ত্র ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার ওপর জোর দিয়েছেন। একইসঙ্গে সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্য সংশোধনী আনার পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন এবং নির্বাচন কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) স্বাধীন ও শক্তিশালী করার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর নির্ধারণের বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটি অগণতান্ত্রিক ও জনগণের অধিকারের পরিপন্থী বলে অনেকের আপত্তি রয়েছে। তবে স্বৈরতন্ত্র রোধে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নিজেই এই প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যে অবস্থান থেকে সরকার এখনো সরে আসেনি। তিনি আরও জানান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো, বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণ ও স্বাধীনতা এবং সংবিধানের প্রস্তাবনা ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি নিয়ে একাধিক প্রস্তাব এসেছে। বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন প্রক্রিয়ার ধাপ ও রূপরেখা নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি; বরং বিষয়টি নিয়ে আরও উন্মুক্ত আলোচনা ও গঠনমূলক পরামর্শ চাওয়া হচ্ছে। কিন্তু আমাদের দলের পক্ষ থেকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাব করেছিলেন যেন কোনো ব্যক্তি ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে না থাকেন। স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়া ঠেকাতেই এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় কিংবা চতুর্থ-কোন ধাপে কীভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার কাঠামো রূপ পাবে, সে বিষয়ে একাধিক বিকল্প উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। এখানে অঙ্গরাজ্যের কোনো সিস্টেম নেই।
দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্ট প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশ একটি একক রাষ্ট্র বা ইউনিটারি গভর্মেন্ট, তাই দ্বিকক্ষ পার্লামেন্টের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। তবে ‘জুলাই জাতীয় সনদে’ যেহেতু এ বিষয়ে ঐকমত্য আছে, তাই কমিটি সে পথেই এগোতে চায়। তিনি আরও জানান, জুলাই সনদের বিভিন্ন বিষয়ে বিরোধী দলের ভিন্নমত বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ থাকলেও আলোচনার দ্বার সব সময় খোলা রাখা হয়েছে। তিনি গণমাধ্যমের মাধ্যমে বিরোধী দলকে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে এসে তাদের মতামত জানানোর আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন। সমঝোতার ভিত্তিতে সব মতপার্থক্য নিরসন সম্ভব বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, পর্যায়ক্রমে কমিটি সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, বিচারক, শিক্ষাবিদ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সামাজিক শক্তি, শহীদ পরিবার এবং গত ১৭ বছরে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সঙ্গে বসবে। সবশেষে ড. আলী রীয়াজের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গেও আলোচনা করা হবে। সবার মতামতের ভিত্তিতে একটি পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট তৈরি করে তা জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে, যার ভিত্তিতে বিল পাসের মাধ্যমে চূড়ান্ত সংবিধান সংশোধনী আনা হবে বলে তিনি জানান।