হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রী ভোগান্তির চিত্রটি দীর্ঘদিনের। লাগেজ পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা, ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের দ্বারা হয়রানি এবং মালামাল বহনের ট্রলি না পাওয়ার মতো ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। সাম্প্রতিক সময়ে তিন তরুণীকে নেপাল যেতে বাধা প্রদান এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আকতারুজ্জামানকে বিমানবন্দর কেন্দ্রিক ঘটনায় গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নেয়ার বিষয়টি নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রবাসীরা তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরছেন, যার সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে পুরনো ঘটনা ও ভিডিও মিশিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, এর পেছনে নির্দিষ্ট মহলের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে। একইসঙ্গে অনেক আগে ঘটা ঘটনার ছবি, ভিডিও দিয়েও কেউ কেউ বিমানবন্দর পরিস্থিতির সমালোচনা করছেন। লাগেজ পাবার পর ট্রলি নিয়ে টানাটানি শুরু হয়।
বিমানবন্দরের ট্রলি সংকট নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে অভিযোগ থাকলেও তা পুরোপুরি সমাধান করা যায়নি। যদিও বেসামরিক বিমান পরিবহন কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় চার হাজার ট্রলি থাকার দাবি করে, কিন্তু বাস্তবে একসাথে একাধিক ফ্লাইট অবতরণ করলে ট্রলি তীব্র সংকটের মুখে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কয়েক মাস আগে সিলেট ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে ট্রলি স্থানান্তর করা হয়েছিল। গত ১লা অক্টোবর মদিনা থেকে আসা একটি ফ্লাইটের যাত্রীদের লাগেজ পেতে দেরি ও ট্রলি সংকটকে কেন্দ্র করে বেল্ট এলাকায় উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে জামায়াত নেতা আকতারুজ্জামান তাকে হুমকি প্রদান করেন। এ সময় প্রটোকল সহায়তাকারীদের ভিডিও ধারণে বাধা দেয়া এবং এক নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ ওঠে। গত কয়েক মাসেও এ চিত্র খুব একটা বদলায়নি। সম্প্রতি ট্রলি সংকটের কয়েকটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে; তার প্রত্যেকটির সত্যতা মিলেছে। সরজমিন বিমানবন্দর এপ্রোন এলাকা ঘুরেও এমন চিত্র দেখা গেছে। যাচাই বাছাই করে দেখা গেছে ভিডিওগুলো অনেক পুরাতন।
সরকারি কাজে বাধা প্রদান, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং দায়িত্বপালনরত কর্মকর্তাকে হুমকির অভিযোগে ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হন সাবেক এমপি মেজর (অব.) আকতারুজ্জামান। এরপর তাকে একদিনের রিমান্ডে নেয়া হয় এবং পরে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার একাধিক ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে তাকে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কর্মীদের সাথে তর্কে জড়াতে দেখা যায়। একই সময়ে সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তির চিত্রও সামনে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরা গণমাধ্যমকর্মী আবুল কালাম জানিয়েছেন, দেড় ঘণ্টা অপেক্ষার পর লাগেজ পেলেও তার একটি ব্যাগ ভাঙা ও অন্যটি খোলা ছিল। সৌদি আরব থেকে ফেরা যাত্রী মফিজুল আলমের অভিযোগ, দীর্ঘ ভ্রমণের পর দেশে নেমে লাগেজ পাওয়ার জন্য ৪৫ মিনিট অপেক্ষা করতে হয়েছে, এরপর ট্রলি পেতে হয়েছে বাড়তি ভোগান্তির মাধ্যমে। তিনি লিখেন, আজ আমেরিকা থেকে দেশে ফিরে এয়ারপোর্টে লাগেজ পেয়েছি দেড়ঘণ্টা পর। আবুল কালামের এই পোস্ট মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়।
এদিকে বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি গোষ্ঠী পরিকল্পিত অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মন্ত্রী এম.রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানিয়েছেন, পুরনো ঘটনা ও ভিডিও ব্যবহার করে নতুনভাবে যাত্রী হয়রানির প্রচার চালানো হচ্ছে যা বিমানবন্দরের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দায়িত্ব পালনে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে, আবার নিষ্ঠাবান কর্মীদের পুরস্কৃত করা হবে।
বিমানবন্দরে দায়িত্বরত বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, সীমিত সক্ষমতার বিপরীতে অধিক চাপ থাকায় সেবা বিঘ্নিত হয় এবং সব সময় ট্রলি সংকট থাকে না; মূলত ফ্লাইটগুলো একসঙ্গে অবতরণ করলে জটিলতা তৈরি হয়। এছাড়া অনেক সময় ইমিগ্রেশনের কিছু কর্মকর্তা ছোটখাটো বিষয়ে যাত্রীদের হয়রানি করেন, যা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তোলে। প্রয়োজনের তুলনায় সরঞ্জামের অভাব এবং কিছু ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত কড়াকড়ি সেবাকে আরও কঠিন করে তুলছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।