চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) এবং ওভারফ্লো কন্টেইনার ইয়ার্ড পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ১৫ বছর মেয়াদী একটি চুক্তি সই হয়েছে। গতকাল আগারগাঁওয়ে ইনভেস্ট বাংলাদেশের কার্যালয়ে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. মনিরুজ্জামান এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান ঈসা কাজিম নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তিতে সই করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সড়ক, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, প্রতিমন্ত্রী রাজীব আহসান, ঢাকায় নিযুক্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ আলী আল হুমুদি এবং ইনভেস্ট বাংলাদেশের নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীসহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
চুক্তির শর্তানুসারে, এনসিটি পরিচালনার মালিকানা ও মূল অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই সংরক্ষিত থাকবে। বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে এটি বিক্রি বা হস্তান্তর করা হচ্ছে না বলে ইনভেস্ট বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। নিরাপত্তা, কাস্টমস, ইমিগ্রেশন এবং সার্বভৌম কর্তৃত্ব বাংলাদেশ সরকারের হাতেই ন্যস্ত থাকবে। সরকার বা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এই চুক্তির বিপরীতে ৬০০ কোটি টাকার অগ্রিম ফি পাবে, যার ২৫ শতাংশ চুক্তি সইয়ের সময় এবং বাকি ৭৫ শতাংশ কার্যক্রম শুরুর আগে পরিশোধ করা হবে। এছাড়া প্রতি ২০ ফুট কন্টেইনারের বিপরীতে টার্মিনালের গড় রাজস্বের ওপর ৪০ থেকে ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত রয়্যালটি পাওয়া যাবে।
অনুষ্ঠানে নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, এনসিটিকে আন্তর্জাতিক মানের লজিস্টিক সংযোগ ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনায় সক্ষম করে গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য। ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান ঈসা কাজিম পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে এই সুযোগ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে ধন্যবাদ জানান। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. মনিরুজ্জামান উল্লেখ করেন যে, এই অংশীদারিত্ব টার্মিনালের পরিচালনাগত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠায় এবং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে। ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী জানান, পিপিপির মাধ্যমে বন্দর পরিচালনা দেশের বাণিজ্যের গতি বৃদ্ধিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আমাদের বৃহত্তর নীতিগত লক্ষ্য হলো বিভিন্ন টার্মিনালে একাধিক আন্তর্জাতিক অপারেটর যুক্ত করে সেবার মান ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সাপ্লাই চেইনে স্থিতিশীলতা আনা। বাংলাদেশ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও উৎপাদন অর্থনীতিতে পরিণত হচ্ছে এবং দেশটির এই উন্নয়নে সহযোগিতা করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ফলে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বাজারের মধ্যে আরও নির্বিঘ্ন যোগাযোগ তৈরি হবে। আমাদের পরিচালনাগত দক্ষতা, প্রযুক্তি এবং পণ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সেবা দেয়ার সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে আমরা বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দেশের ব্যবসাগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরিতে সহায়তা করতে চাই। একইসঙ্গে বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য আরও শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হবে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কন্টেইনার পরিবহনের প্রায় ৪৪ শতাংশ এনসিটি দিয়ে সম্পন্ন হয়। ডিপি ওয়ার্ল্ড নিজস্ব অর্থায়নে টার্মিনালের আধুনিকায়নে বিনিয়োগ করবে। প্রথম ১০ বছরে যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়নে ১ হাজার কোটি টাকারও বেশি মূলধনী বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। বিশ্বব্যাপী ৪০টিরও বেশি দেশে ৮০টির বেশি টার্মিনাল পরিচালনা করা প্রতিষ্ঠানটি বৈশ্বিক কন্টেইনার পরিবহনের প্রায় ১০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। ইনভেস্ট বাংলাদেশের ভাষ্যমতে, এই চুক্তিতে কোনো প্রকার ঋণ নেয়ার প্রয়োজন নেই, যা শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের সাথে তুলনার অবকাশ রাখে না।
চুক্তিতে ঝুঁকি ভাগাভাগি, ট্রাফিক মূল্যায়ন এবং মুদ্রা বিনিময়জনিত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সুনির্দিষ্ট বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া অপারেটরের কর্মকাণ্ড তদারকির জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বিশেষ ক্ষমতা থাকবে। ট্রাকের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম এবং ক্রেনের উৎপাদনশীলতার মতো সূচকগুলোতে টানা তিন মাস লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে ব্যর্থ হলে আর্থিক জরিমানার বিধানও যুক্ত করা হয়েছে। স্থানীয় কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে জানানো হয়, এনসিটিতে বর্তমানে কর্মরত জনবলকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নতুন পরিচালন কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং তাদের দক্ষ করে তুলতে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। তবে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগী বন্দরগুলোর তুলনায় কন্টেইনার জাহাজে অবস্থানের সময়, পণ্য খালাসে সময়, যন্ত্রপাতির সক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রে এখনো ঘাটতি রয়েছে।
এদিকে, এনসিটি পরিচালনার প্রক্রিয়াটি আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকে পিপিপি ও জি-টু-জি কাঠামোয় শুরু হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে দরকষাকষির পর্যায়ে শ্রমিক আন্দোলন ও আপত্তির কারণে এটি সাময়িকভাবে থমকে ছিল, যা পরবর্তীতে পুনরায় আলোচনা শুরু হয়। বর্তমানে চিটাগং ড্রাই ডক লিমিটেড এনসিটি পরিচালনা করছে এবং বিদেশি অপারেটর পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব নেয়ার আগ পর্যন্ত তারা এই কার্যক্রম চালিয়ে যাবে।
চুক্তি স্বাক্ষরের দিন ইনভেস্ট বাংলাদেশের কার্যালয়ের সামনে সিপিবি ও বাসদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও শ্রমিক সংগঠন বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। বিক্ষোভকারীদের বাধার মুখে পড়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রীর গাড়ি। বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে বিক্ষোভকারীদের সাথে ধস্তাধস্তিতে সাজ্জাদ জহির চন্দনসহ অনেক নেতাকর্মী আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বোর্ড অব ডিরেক্টরসের চেয়ারম্যান ঈসা কাজিমের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব নাজমুল হক জানান, সাক্ষাতে ১৫ বছর মেয়াদী কনসেশন চুক্তি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এসময় ফ্রি ট্রেড জোন এবং রেলভিত্তিক ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপো স্থাপনে ডিপি ওয়ার্ল্ডের আগ্রহের বিষয়ে খোঁজখবর নেন।