1. admin@ajkerbasundhara.com : admin :
শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩৪ অপরাহ্ন

প্রতিদিন ঝরছে ৪০ শিশুর প্রাণ

স্টাফ রিপোর্টার
  • প্রকাশ : শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬

গত ১৪ সেপ্টেম্বর দুপুরবেলা। দেবীদ্বারের ফুলতলী গ্রামে নিজের বাড়ির আঙিনায় খেলছিল শিশু আহমেদ। পৃথিবীর সবকিছুই তার কাছে তখন নতুন ও কৌতূহলী। মা নিপা আক্তার দৈনন্দিন কাজের ব্যস্ততার ফাঁকে সন্তানের দিকে নজর রাখছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, মাত্র এক মিনিটের জন্য তিনি শিশুটিকে চোখের আড়াল করেছিলেন। এই সামান্য সময়টুকুতেই ঘটে যায় অঘটন। বাড়ির পাশের পুকুরে আহমেদকে খুঁজে পাওয়া না গেলেও, পরে তার নিথর দেহ ভেসে ওঠে পানিতে। আহমেদের পরিবারের শোকের এই ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের অজস্র পরিবারের দীর্ঘশ্বাসের প্রতিচ্ছবি। পৃথিবীকে তখনো ঠিকমতো চিনে ওঠার বয়স হয়নি তার। হাঁটতে শেখার আনন্দ, চারপাশের নতুন জিনিস দেখার কৌতূহল আর নিজের মতো করে ছুটে বেড়ানো—এটাই ছিল তার পৃথিবী। কিন্তু মানুষের জীবন তো সব সময় একই মুহূর্তে আটকে থাকে না। প্রথমে নিপা ভেবেছিলেন, খেলতে খেলতে ছেলে একটু দূরে গেছে। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই তাঁর মনে ভয় ঢুকে পড়ে। শুধু তাঁরাই নন, বাড়ির সবাই তখন আহমেদকে হন্যে হয়ে খুঁজতে শুরু করেন। মুহূর্তেই চারপাশে হইচই ও মায়ের আর্তনাদ শুরু হয়। সময় মাপার ঘড়িতে এক মিনিট খুব বেশি কিছু নয়।

ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর ১৪ হাজারের বেশি শিশু পানিতে ডুবে প্রাণ হারায়। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ এটি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুসারে, এই বয়সী শিশুদের মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ হলো পানিতে ডুবে যাওয়া। পরিসংখ্যানটি ভয়াবহ—প্রতিদিন গড়ে ৪০টি শিশুর জীবন এভাবেই থেমে যায়। সরকারি ও বিভিন্ন বেসরকারি জরিপের তথ্যমতে, প্রতিবছর সব বয়সী প্রায় ১৯ হাজার মানুষ পানিতে ডুবে মারা গেলেও এর মধ্যে ১৮ বছরের কম বয়সীর সংখ্যা প্রায় ১৪ হাজার ৫০০। পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার।

পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর বড় একটি অংশ ঘটে বাড়ির আশপাশে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৮০ শতাংশ শিশুমৃত্যু ঘটে পুকুরে এবং সিংহভাগ ঘটনা বাড়ি থেকে ২০ গজের মধ্যে। বিশেষ করে সকাল ৯টা থেকে বেলা ১টার মধ্যবর্তী সময়ে—যখন অভিভাবকরা সংসারের নানা কাজে ব্যস্ত থাকেন—তখন প্রায় ৬০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে। এক থেকে চার বছর বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে, কারণ তারা বিপদের মাত্রা বুঝতে পারে না এবং সাঁতারও জানে না।

একটি শিশুর মৃত্যু মানে একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ। শুধু মায়ের সতর্কতায় এই বিশাল সংখ্যক প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব নয়। সমাধানের লক্ষ্যে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ ইতিমধ্যে নেওয়া হয়েছে। যেমন সিআইপিআরবি ও সহযোগী সংস্থাগুলোর মাধ্যমে ১ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য এলাকাভিত্তিক দিবাযত্ন কেন্দ্র ‘আঁচল’ পরিচালনা করা হচ্ছে। এছাড়া ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের সাঁতার ও পানিতে উদ্ধার কৌশল শেখানোর জন্য ‘সুইমসেফ’ কার্যক্রম চালু রয়েছে। এগুলো প্রমাণ করে যে যথাযথ উদ্যোগ নিলে শিশুমৃত্যুর হার কমানো সম্ভব।

সড়ক দুর্ঘটনা বা অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যুর ঘটনা যেভাবে জাতীয়ভাবে আলোচনার জন্ম দেয়, পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু কেন সেভাবে গুরুত্ব পায় না? আমরা কি এই অকাল মৃত্যুগুলোকে এতটাই স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিয়েছি? প্রতিদিন গড়ে ৪০টি শিশুর প্রাণ ঝরে যাওয়া কোনোভাবেই কেবল পারিবারিক অসতর্কতা বা দুর্ঘটনা হিসেবে দেখা যায় না; বরং এটি একটি বড় জাতীয় সংকট।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটে পুকুর, নদী ও খাল-বিল আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখান থেকে দূরে থাকা সম্ভব নয়, প্রয়োজন পানির সঙ্গে নিরাপদ সহাবস্থান তৈরি করা। শিশুদের খেলার জায়গা এবং পানির উৎসকে পৃথক করার পরিকল্পনা গ্রহণ, বাড়ির পাশে থাকা জলাশয়ে সুরক্ষাবেষ্টনী দেওয়া এবং সামাজিকভাবে সচেতনতা তৈরির বিকল্প নেই। মা-বাবার একার দায়িত্বের ওপর ভরসা না রেখে রাষ্ট্র, স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজকে সম্মিলিতভাবে এই ঝুঁকি মোকাবিলায় এগিয়ে আসতে হবে। একটি শিশুর জীবন মাত্র এক মিনিটের আড়ালের কাছে হারিয়ে যাওয়ার মতো তুচ্ছ নয়।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
২০২৬ © আজকের বসুন্ধরা কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
Theme Customization By NewsSun