বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রের সোনালী সময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী নাসিমা খান গতকাল রোববার সন্ধ্যায় না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। দীর্ঘ দিন অসুস্থ থাকার পর শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এই শিল্পী। অভিনয়ের পাশাপাশি বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের অধিকারী নাসিমা খান ব্যক্তিগত জীবনে নানা সুখ-দুঃখের স্মৃতি ও নিখোঁজ ছেলের প্রতীক্ষায় দীর্ঘ সময় পার করেছেন। স্বামী একজন অতিথিকে গাড়িতে করে পৌঁছে দিতে গেছেন। হঠাৎ খবর আসে, স্বামী সড়ক দুর্ঘটনায় পড়েছেন। মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফিরে দেখা হচ্ছে তাঁর অভিনয়জীবনের নানা অধ্যায়।
১৯৪৪ সালের ৬ আগস্ট পুরান ঢাকার লালবাগে জন্মগ্রহণ করেন নাসিমা খান। তাঁর পৈতৃক নিবাস মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার রাঢ়িখাল গ্রামে। ব্যবসায়ী বাবা মোহাম্মদ মাসুদ খান ও সংস্কৃতিমনা পরিবারে বেড়ে ওঠা নাসিমা ছোটবেলা থেকেই নাচ ও অভিনয়ের প্রতি অনুরাগী ছিলেন। মাত্র ১২ বছর বয়সে ১৯৫৯ সালে এ জে কারদার পরিচালিত ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় তাঁর অভিষেক ঘটে। পরিবারে অভিনয়ের শুরুতে কিছুটা আপত্তি থাকলেও বড় চাচার সমর্থনে তিনি অভিনয় চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান।
১৯৯০ সালে সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’র ঈদ সংখ্যায় চলচ্চিত্র সমালোচক মাহমুদা চৌধুরীর অনুলিখনে নাসিমা খান তাঁর কর্মজীবনের নানা অজানা অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য ছবির তালিকায় রয়েছে ‘সূর্যস্নান’ ও ‘কার বউ’। ১৯৬২ সালে সালাহউদ্দিন পরিচালিত ‘সূর্যস্নান’ সিনেমায় দ্বিতীয় নায়িকার চরিত্রে অভিনয়ের সময় তিনি নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। প্রথমদিকে অভিনয়ের ধরনে কিছুটা আড়ষ্ট থাকলেও পরিচালকের নির্দেশনায় ১২ থেকে ১৪ বার চেষ্টার পর দৃশ্যটি নিখুঁতভাবে ধারণ করা সম্ভব হয়েছিল। এই ছবির সাফল্য তাঁর অভিনয়ের প্রতি আত্মবিশ্বাস অনেক গুণ বাড়িয়ে দেয়। পরিচালকের নির্দেশমতো দৌড় দিলেন নায়িকা।
নাসিমা খানের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে ‘কার বউ’ সিনেমার শুটিংয়ের এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা। ১৯৬৬ সালে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমার দৃশ্যে স্বামীর দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দৌড়ে সিঁড়ির কাছে যাওয়ার সময় পরিচালক নজরুল ইসলাম আচমকা তাঁকে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দিয়েছিলেন। দৃশ্যটি ধারণের আগে তাঁকে বিষয়টি জানানো হয়নি। এই দুর্ঘটনায় তিনি এতটাই আঘাত পেয়েছিলেন যে তিন দিন নড়াচড়া করতে পারেননি। তবে এই ঘটনা নিয়ে তিনি পরিচালকের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেননি, বরং তৎকালীন চলচ্চিত্রাঙ্গনের পারিবারিক আবহ ও আন্তরিক সম্পর্কের কথা স্মরণ করেছেন। খবর শুনে চিৎকার দিয়ে সিঁড়ির দিকে ছুটতে হবে নববধূকে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই গড়িয়ে পড়লেন নিচে। পরিচালক নজরুল ইসলামের আচমকা ধাক্কায় সেদিন সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়েছিলেন তিনি।
তিনি জানিয়েছেন, ‘কার বউ’ ছিল সেসময়ের সাড়া জাগানো হাসির সিনেমা। এতে তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন হারুন, গোলাম মোস্তফা ও সুভাষ দত্তসহ অনেকে। পরিচালক নজরুল ইসলামকে তিনি ‘নজু ভাই’ বলে সম্বোধন করতেন এবং কর্মক্ষেত্রে কাজের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও আন্তরিকতা বজায় থাকত বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে পেশাদার প্রতিযোগিতা থাকলেও ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল খুবই চমৎকার।
১৯৭৫ সালে তিনি চলচ্চিত্রাঙ্গনের বাইরের একজনকে বিয়ে করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৯ সালে টেলিভিশনে উপস্থাপনার মাধ্যমে তিনি আবারও পর্দায় ফিরে আসেন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে বড় ছেলে শাবাব নাসিম রহমান যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করলেও ছোট ছেলে নাবিল নাছির রহমান কুশল ১১ ফেব্রুয়ারি বাড়ি থেকে বেরিয়ে আর ফেরেননি। নিখোঁজ ছেলেকে খুঁজে পাওয়ার আকুতি নিয়েই শেষ জীবন অতিবাহিত করেন এই অভিনেত্রী।
নাসিমা খান ঢাকার আশুলিয়ার পাথালিয়া ইউনিয়নের নিরিবিলি স্বপ্নবিলাস এলাকায় বসবাস করতেন। গতকাল রোববার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। বাংলা চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের বিদায় শোকের ছায়া ফেলেছে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে।