1. admin@ajkerbasundhara.com : admin :
মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:২০ অপরাহ্ন

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে থাইল্যান্ডের সাফল্য: বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা?

স্টাফ রিপোর্টার
  • প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬

বৈদ্যুতিক গাড়ি, আধুনিক ইলেকট্রনিকস এবং উন্নত তথ্যপ্রযুক্তির মতো উচ্চমূল্যের খাতে বিদেশি বিনিয়োগ টানার ক্ষেত্রে থাইল্যান্ড বর্তমানে এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশটির বিনিয়োগ বোর্ডের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে থাইল্যান্ডে বিনিয়োগের লক্ষ্যে প্রায় ৩ হাজার ৩৭০টি প্রকল্পের আবেদন জমা পড়েছে। এই প্রকল্পগুলোতে প্রস্তাবিত বিনিয়োগের সম্মিলিত পরিমাণ প্রায় ৬ হাজার ২৩ কোটি ডলার, যা গত ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৬৭ শতাংশ বেশি। এমন সাফল্য অর্জনে থাইল্যান্ডের কৌশলগত অবস্থান এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন বিশ্বের বড় বড় বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। তা সত্ত্বেও এগুলো দেখায়, ভবিষ্যৎ শিল্পের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে থাইল্যান্ড সক্রিয় রয়েছে। প্রকল্পের ধরন ও যোগ্যতা অনুযায়ী করসুবিধা, যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কছাড় এবং অন্যান্য সহায়তাও রয়েছে। অর্থাৎ বিদেশি বিনিয়োগকে দেশীয় শিল্পের বিকাশের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছে থাইল্যান্ড।

বিনিয়োগের এই ঊর্ধ্বগতি শুধু বছরের হিসেবে নয়, বরং বছরের প্রথম ছয় মাসের তথ্যেও স্পষ্ট। চলতি বছরের প্রথম অর্ধে বিনিয়োগ উন্নয়ন সুবিধা পাওয়ার জন্য জমা পড়া প্রস্তাবগুলোর মোট মূল্য ছিল প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি বাথ, যা পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩৯ শতাংশ বেশি। ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসার এবং তথ্যকেন্দ্র বা ডেটা সেন্টার নির্মাণে আগ্রহীদের ভিড়ই মূলত এই প্রবৃদ্ধির মূল কারিগর। শুধুমাত্র ডেটা সেন্টার তৈরির জন্যই ২৮টি পৃথক প্রকল্পের বিপরীতে ৫২ হাজার ১২০ কোটি বাথ বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে। আর সব মিলিয়ে ডিজিটাল খাতের প্রকল্পগুলোতে মোট ৫২ হাজার ২৬০ কোটি বাথ বিনিয়োগের আবেদন জমা পড়েছে, যা দেশটির ডিজিটাল রূপান্তরের আকাঙ্ক্ষাকেই ত্বরান্বিত করছে। দেশটির অন্যতম কৌশল হলো সব শিল্পকে সমান সুবিধা না দিয়ে নির্দিষ্ট কিছু খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

থাইল্যান্ডের এই বিশাল সাফল্যের বিপরীতে বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত পরিবর্তনের তাগিদ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকরা। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে শিল্পাঞ্চলের সাথে বন্দর ও প্রধান পরিবহনপথের নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ স্থাপন করা সবচেয়ে জরুরি। একই সাথে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। পণ্য খালাসের জটিলতা কমিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে শুল্কায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারলে তা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে সহায়তা করবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়াতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কোনো আবেদন ঝুলে থাকলে তার যৌক্তিক কারণ দর্শানো ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।

বিনিয়োগ আকর্ষণে কার্যকর বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে তাদের অভিযোগের দ্রুত বিচার, চুক্তির শতভাগ বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা এবং বাণিজ্যিক বিরোধ নিরসনে একটি সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর আইনি কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা তখনই নতুন কোনো দেশে পা রাখেন, যখন তারা তাদের মূলধনের নিরাপত্তা এবং আইনগত সুরক্ষা সম্পর্কে নিশ্চিত হন।

ইতিমধ্যে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে এ নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, থাই ব্যবসায়ীদের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় কৃষিজাত পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালাল খাদ্য উৎপাদন এবং সামগ্রিক শিল্পায়নের উজ্জ্বল সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে। থাই বিনিয়োগকারীরাও বাংলাদেশের এসব খাতে বিনিয়োগ করতে বেশ আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বাণিজ্য সম্প্রসারণে দুই দেশের সমুদ্রপথের সংযোগ বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে, বিশেষ করে থাইল্যান্ডের রেনং বন্দর ও বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরের মধ্যে সামুদ্রিক রুট চালুর মাধ্যমে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের পরিকল্পনা রয়েছে। যথাযথ সংস্কার ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশও থাইল্যান্ডের মতো বিদেশি বিনিয়োগের অন্যতম গন্তব্যে পরিণত হতে পারে। ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সভাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান নিয়ে আলোচনার মধ্যে থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতা নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। এর লক্ষ্য শুধু বিদেশি কোম্পানিকে এনে কারখানা স্থাপন করানো নয়; বরং স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা, যন্ত্রাংশ উৎপাদন বাড়ানো, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। কোন খাতে বিনিয়োগ এলে রপ্তানি বাড়বে, কোথায় বেশি কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং কোন শিল্প দেশীয় উদ্যোক্তাদের সঙ্গে সংযোগ গড়ে তুলবে—তা বিবেচনা করে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। শুধু করছাড় বা প্রণোদনা ঘোষণা করে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
২০২৬ © আজকের বসুন্ধরা কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
Theme Customization By NewsSun