বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনা প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করলেও, মুক্তিযুদ্ধে দেশের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর অবাঙালি জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল অনস্বীকার্য। অনেক অবাঙালি মুক্তিযোদ্ধা অসম সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ স্বাধীনতা-উত্তর সরকারের কাছ থেকে রাষ্ট্রীয় খেতাবও পেয়েছিলেন। তবে ১৯৭২ সালে নতুন রাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়নের সময় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কেবল ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-কেই রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করে। সংবিধানের এই ধারায় বাঙালি জাতিকে ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত একক সত্তা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে জাতীয় ঐক্য ও সংহতির ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সমালোচকদের মতে, এই অনুচ্ছেদের মাধ্যমে ভারতের পশ্চিম বাংলার বাঙালি থেকে বাংলাদেশের বাঙালিদের আলাদা করার চেষ্টা করা হলেও, স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীগুলোকে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি প্রদানে রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়। আমরা আগেই বলেছি, বাংলাদেশের সশস্ত্র স্বাধীনতাযুদ্ধের পেছনে প্রধানত বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনা সক্রিয় থাকলেও, দেশটির অপরাপর অবাঙালি সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীসমূহের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ সেই মরণপণ যুদ্ধে নানাভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সাংবিধানিকভাবে গৃহীত এই জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞা নিরূপণ করেলেখা হয়, “ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত একক সত্তাবিশিষ্ট যে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ ও সংকল্পবদ্ধ সংগ্রাম করিয়া জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন করিয়াছেন, সেই বাঙালি জাতির ঐক্য ও। 286. কিন্তু অগ্রে জাতি ভাষা না শিখিয়া পরের ভাষা শিখা কোনও মতে উচিত নহে।”২৯০ তথ্যসূত্র: ২৮৬ দেখুন, প্রাগুক্ত, ১৯৭২, অনুচ্ছেদ ৯ ২৮৭ আনিসুজ্জামান, “আমাদের মুক্তিসংগ্রাম ও সংবিধানের মূলনীতি”, বাঙালী ও বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা: ১১৪। একটি রাষ্ট্রকে একই সঙ্গে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ও ‘ধর্মীয়প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে বিকশিত করার ধারণাটি হাস্যকর বটে। 124 ২৮৯ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, ২০১১, অনুচ্ছেদ ৬[২] ২৯০ ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা, “বাক্যকথন – ভাষা”, বোধোদয়, পৃষ্ঠা: ৩২। বিভিন্ন বস্তুনিষ্ঠ গবেষণার ধরন ও গবেষণালব্ধ তথ্য-উপাত্তের বিশ্লেষণপদ্ধতি থেকে আমাদের প্রয়োজনীয় জ্ঞান আহরণ ও প্রয়োজনে তা প্রয়োগ করার দক্ষতা অর্জন করা আবশ্যক।
স্বাধীনতা-উত্তর শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে এক ধরনের উৎকট জাতিবাদী আত্মাভিমান লক্ষ্য করা যায়, যার ফলে সংখ্যালঘু জাতিসত্তাসমূহকে ‘উপজাতি’ হিসেবে অধস্তন মর্যাদা দেওয়া হয়। তৎকালীন প্রধান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান অবাঙালি জাতিগোষ্ঠীগুলোকে বাঙালি হয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত চাকমাসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে ‘নিছক ট্রাইব’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে উন্নীত করার যে আকাঙ্ক্ষা মুজিব প্রকাশ করেছিলেন, তা আসলে ঔপনিবেশিক মানসিকতা ও উগ্র জাতিবাদী রাজনীতিরই বহিঃপ্রকাশ। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে হিটলারের ফ্যাসিবাদী ভাবাদর্শে জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ববাদের যে প্রতিফলন দেখা গিয়েছিল, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের শাসকশ্রেণির এই প্রবণতাকে অনেকের মতে তার সাথে তুলনা করা যায়। শুধু তা-ই নয়, স্বাধীনতা-উত্তর বাঙালি শাসকশ্রেণির ‘জাতিবাদী’ আত্মাভিমান এমন উৎকট পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, এই শাসকশ্রেণি অবাঙালি সংখ্যালঘু জাতিসত্বাগুলোকে ‘উপজাতি’র অধস্তন মর্যাদায় চিহ্নিত করে এবং সেই শাসকশ্রেণির প্রধান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এদেশের অবাঙালি। 287. ‘নিছক ট্রাইব’ আখ্যায়িত করে, মুজিব নিজের কথিত‘ঔদার্যবশত’ তাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে ‘প্রমোশন’ দেয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছিলেন।২৮৮ মুজিব ও লীগের তরফে এই ‘ঔদার্য’ প্রদর্শনের আকাঙ্ক্ষা আসলে ছিল বর্ণবাদী ঔপনিবেশিক চিন্তার অনুবর্তী এক উগ্র ‘জাতিবাদী’ রাজনীতির উৎকট অভিপ্রকাশ। অন্যদিক থেকে দেখলে, জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ববাদ যদি ফ্যাসিবাদী ভাবাদর্শের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক উপাদান হয়ে থাকে – বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে হিটলারের নেতৃত্বাধীন জার্মান শাসকশ্রেণীর চিন্তার মধ্যে আমরা যেমন দেখতে পাই – তাহলে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে স্বাধীনতা-উত্তর। ২৮৮ Dr. Mizanur Rahman Shelley (ed।
পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদী সরকারের আমলে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-কে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়, যা সকল জাতিগোষ্ঠীর জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়ার দাবি রাখে। তবে তখনও রাষ্ট্রযন্ত্রে অবাঙালিদের প্রতি ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ বা ‘ট্রাইব’-এর মতো নেতিবাচক ও উপনিবেশবাদী অভিধা ব্যবহারের প্রবণতা অব্যাহত ছিল। এই দীর্ঘকালীন সংকট নিরসনে ২০১১ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এক পরস্পরবিরোধী অবস্থান তৈরি করে। সেখানে উল্লেখ করা হয় যে, বাংলাদেশের জনগণ জাতিগতভাবে বাঙালি এবং নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশি। এই ব্যাখ্যায় অবাঙালি জাতিগোষ্ঠীগুলোর জাতীয় পরিচয়ও কার্যত বাঙালি সত্তার মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু তখনো বাঙালি শাসকশ্রেণির দিক থেকে অবাঙালি জাতিগোষ্ঠীসমূহকে ‘ট্রাইব’, ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ প্রভৃতি উপনিবেশবাদী চিন্তাপ্রসূত নেতিবাচক বিশেষণে আখ্যায়িত করা হতো – আজও তা অব্যাহত রয়েছে।এ বিষয়ে সমাজে ইতিমধ্যে বহু আলোচনা, সমালোচনা ও পর্যালোচনার। 2011. “বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসাবে বাঙালি এবং নাগরিক হিসাবে বাংলাদেশি বলিয়া পরিচিত হইবেন।”২৮৯ স্পষ্টতই, বাংলাদেশের জনগণের অংশ হিসেবে, অবাঙালি জাতিগোষ্ঠীসমূহের জাতীয় পরিচয়ও ‘বাঙালি’ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত থাকে।
একইভাবে, রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্রধর্মের প্রশ্নেও লীগ সরকার সুবিধাবাদী অবস্থান গ্রহণ করে। একদিকে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা হলেও ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে রাখা হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আদর্শের সাথে সাংঘর্ষিক। যখন কোনো রাষ্ট্র সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকদের ধর্মবিশ্বাসকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেয় কিন্তু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে অধস্তন অবস্থানে রাখে, তখন তাকে পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলা কঠিন। মূলত উৎকট জাতিবাদ ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা এদেশের শাসকশ্রেণির ঔপনিবেশিক চিন্তারই ধারাবাহিকতা।
ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকার দেশগুলোতে পাঁচ শতাধিক বছর ধরে ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার রাজনীতির মাধ্যমে যেভাবে শোষণ জারি রেখেছিল, তার বিষফল আজও উপনিবেশোত্তর রাষ্ট্রগুলোর মনোজগতে বিদ্যমান। এই ইতিহাসচর্চা ও শিক্ষানীতির প্রভাব কাটিয়ে ওঠা জরুরি। কেবল পুরনো ঔপনিবেশিক শক্তিকে অভিসম্পাত নয়, বরং সমতাভিত্তিক গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের জন্য পুরনো ইতিহাসের নেতিবাচক অবশেষ থেকে মুক্তি এবং সৃজনশীল ইতিহাস নির্মাণের প্রস্তুতি এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশসহ সকল উপনিবেশোত্তর রাষ্ট্রকে যথার্থ মুক্তি পেতে হলে সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী আধিপত্যবাদ, জাতিচিন্তা ও শিক্ষানীতির বিউপনিবেশায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তরুণ প্রজন্মের জন্য এই ইতিহাসের বিশ্লেষণ ও মননের বিউপনিবেশায়নই নতুন রাষ্ট্র গঠনের মূল চাবিকাঠি। ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতি ৩৪। আমরা এই দীর্ঘ প্রবন্ধে দীর্ঘক্ষণ ধরে দেখেছি, ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ নিজেদের স্বার্থে এশিয়া, আফ্রিকা এবং উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার নানা দেশে, ৫০০ বছরেরও বেশী সময় ধরে, ইতিহাস-চর্চা, ভাষা ও শিক্ষার উপনিবেশবাদী রাজনীতির ম। সেই ঔপনিবেশিক শোষন-শাসন ও নিপীড়নের দীর্ঘস্থায়ী বিষফল উপনিবেশোত্তর দেশ ও রাষ্ট্রসমূহের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনকে নেতিবাচকভাবে কিভাবে প্রভাবিত করেছে, করে চলেছে এখনো, তাও এই প্রবন্ধে আলোচিত হয়েছে। উপনিবেশোত্তর যে-কোনো সমাজের বিশেষত তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য এই ইতিহাস জেনে রাখা শুধু নয়, নিরন্তর মনে রাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। The Chittagong Hill Tracts of Bangladesh: The Untold Story, p। নয় এবার অতি সংক্ষেপে কয়েকটি সতর্কতামূলক প্রতিপাদ্য উপস্থাপন করেবর্তমান রচনাটির ইতি টানব। প্রথমত, আমরা ইতিপূর্বে বলেছি, আমাদের উপনিবেশোত্তর দেশগুলোর সমাজ ও রাষ্ট্রের যথার্থ গণতান্ত্রিক মুক্তির জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে তাদের আপন আপন ইতিহাসকে পশ্চিমা উপনিবেশবাদী বয়ান থেকে মুক্ত করে, বস্তুনিষ্ঠ গবেষণার ভিত্তিতে, নিজেদের ইতিহাসের পুনর্গঠন করতে হবে। আমাদের বরং মনে রাখতে হবে যে, ইউরোপের উপনিবেশবাদী বুদ্ধিজীবী শ্রেণি তাদের আপন আপন দেশ ও জনগোষ্ঠীর উন্নততর বিকাশের স্বার্থে উপনিবেশিত অঞ্চলের ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষাব্যবস্থাকে বিকৃত করলেও, নিজেদের ক্ষেত্রে জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা পরিসরে সুস্থ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ। ফলে, আমাদের নিজেদের ভাষাকে ভালোভাবে রপ্ত করার পাশাপাশি,উপনিবেশোত্তর দেশগুলোর যত বেশি মানুষ যত বেশি ভাষার ওপর নিজেদের দখল বাড়াতে পারবে, সেসব ভাষায় ধারণকৃত নানামুখী জ্ঞানের ভেতর আমাদের প্রবেশযোগ্যতা ততই বৃদ্ধি পাবে – যা প্রকারান্তরে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর এমনকি।