২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান দমনের নামে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বড় ধরনের আইনি ও রাজনৈতিক সংকটে পড়েছে আওয়ামী লীগ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ মঙ্গলবার দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ শীর্ষ সাত নেতার মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেছে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দুপুর সোয়া ১২টার দিকে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় দেন। রায়ে উল্লেখ করা হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারীদের দমন, হত্যা, হামলা এবং উসকানি ও প্ররোচনা প্রদানের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তরা সরাসরি জড়িত ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি অনুযায়ী, উত্থাপিত অভিযোগগুলোর অধিকাংশই আদালতের কাছে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত অন্য ছয়জন নেতা হলেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন। এর আগে একইভাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও একই ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছেন। আদালত কেবল মৃত্যুদণ্ডই নয়, একই সঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচ আসামির স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির ৫০ শতাংশ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। বিক্রিলব্ধ অর্থ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রদানেরও নির্দেশনা রয়েছে রায়ে।
মামলার বিচারিক কার্যক্রমের গতিপ্রকৃতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ১৮ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে সাতটি অভিযোগ থাকলেও পরবর্তীতে চারটি অভিযোগের ভিত্তিতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়। ২০২৬ সালের ২২ জানুয়ারি অভিযোগ গঠন এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে সাক্ষ্য গ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। দীর্ঘ সময় ধরে মোট ২৯ জন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করা হয় এবং ২ আগস্ট সাক্ষ্য গ্রহণ সমাপ্ত হয়। তবে রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আসামি পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা গেছে। আইনজীবী ইসরাত জাহান রায়ের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
এদিকে, এই রায় ঘোষণার সমান্তরালে রাজধানীর নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপরও এর প্রভাব দৃশ্যমান হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান ফটকের সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, ঘটনাটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। রায়ের প্রতিক্রিয়া প্রসঙ্গে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, আদালতের রায় নিয়ে সরকারের আলাদা করে কোনো মন্তব্যের সুযোগ নেই। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ফাঁসির রায়ে সরকার খুশি কি না সেটি মূখ্য নয়, বরং দেশে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়াই বর্তমান সরকারের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও মন্তব্য করেন, অভিযুক্তরা পলাতক না থেকে দেশে থাকলে আইন অনুযায়ী নিজেদের স্বপক্ষে যুক্তি তুলে ধরার সুযোগ পেতেন। বর্তমানে এই রায়ের ফলে রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে এক চরম নাজুক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ১৫ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ পলাতক অবস্থায় অনুপস্থিত সাত আসামিকে সর্বোচ্চ সাজা দেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আসামিদের বিরুদ্ধে মোট সাতটি অভিযোগ আনা হলেও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের সময় তা চারটি অভিযোগে নির্ধারণ করা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কয়েক দফা শুনানি শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয় এবং মঙ্গলবার রায় ঘোষণা করা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রায়ে ওবায়দুল কাদেরকে একাধিক অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড এবং একটিতে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি বিক্রির অর্থ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহত ব্যক্তি অথবা তাদের পরিবারের মধ্যে জুলাই ফাউন্ডেশন কিংবা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।