প্রবাসী আয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উন্নতি এবং সার্বিক লেনদেন ভারসাম্যে বড় ধরনের উদ্বৃত্তের কারণে বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতের ভিত্তি বর্তমানে বেশ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের সার্বিক লেনদেন ভারসাম্যে ৬৬১ কোটি ডলারের উদ্বৃত্ত দেখা গেছে, যা আগের অর্থবছরের ৩৩৯ কোটি ডলারের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই রেমিট্যান্স প্রবাহ ও রিজার্ভ বৃদ্ধির এই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ উদ্বৃত্ত ছিল ৩৩৯ কোটি ডলার।
প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের প্রবাহেও উল্লেখযোগ্য গতি এসেছে। গত আগস্ট মাসে প্রবাসীরা প্রায় ২৯৭ কোটি ডলার দেশে পাঠিয়েছেন, যা আগের বছরের একই সময়ের ২৪২ কোটি ডলারের তুলনায় প্রায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। এছাড়া চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) মোট প্রবাসী আয় এসেছে প্রায় ৫৮৩ কোটি ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ শতাংশ বেশি। উল্লেখ্য, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ৩ হাজার ৫৫৯ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল। জুলাইয়ের ২৮৬ কোটি ডলারের তুলনায় আগস্টে আয় বেড়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। আগের অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৩৩ কোটি ডলার। ২০২৫ সালের একই সময়ে এসেছিল ১ হাজার ৬৭৪ কোটি ডলার। এক বছর আগে, ২০২৫ সালের আগস্ট শেষে রিজার্ভ ছিল ৩ হাজার ১১৭ কোটি ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, প্রবাসী আয়ের এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক খাতের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। এটি আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসীদের আস্থার বহিঃপ্রকাশ। আনুষ্ঠানিক মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানো আরও সহজ ও আকর্ষণীয় করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকার নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। এ বছরের মার্চ থেকে আগস্ট—এই ছয় মাসে ১ হাজার ৮৯৪ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রবাসীদের আস্থারও প্রতিফলন ঘটছে এতে।
প্রবাসী আয়ের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও সন্তোষজনক হারে বাড়ছে। আগস্ট মাস শেষে মোট রিজার্ভ ৩ হাজার ৭৩৫ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা জুলাই শেষে ছিল ৩ হাজার ৬৪২ কোটি ডলার। আইএমএফের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে হিসাব করলে আগস্ট শেষে রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ২৪৪ কোটি ডলার, যা এক বছর আগের ২ হাজার ৬১৭ কোটি ডলার থেকে ৬২৭ কোটি ডলার বেশি। বৈদেশিক মুদ্রার বাজারেও এখন স্থিতিশীলতা বিরাজ করছে; ২৩ সেপ্টেম্বর ডলারের বিনিময় হার ছিল ১২৩ টাকা ১৭ পয়সা। আগস্ট শেষে এ হিসাবে রিজার্ভ ছিল ৩ হাজার ২৪৪ কোটি ডলার, জুলাই শেষে যা ছিল ৩ হাজার ১৫৮ কোটি ডলার। আগস্টের শেষে এ হার ছিল প্রায় ১২৩ টাকা ২১ পয়সা।
লেনদেন ভারসাম্যের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাণিজ্য ঘাটতি ও চলতি হিসাবে কিছুটা ঘাটতি থাকলেও আর্থিক হিসাবে ৭৯০ কোটি ডলারের উদ্বৃত্ত থাকায় সামগ্রিক পরিস্থিতি ইতিবাচক হয়েছে। এর পাশাপাশি আমদানি কার্যক্রমেও গতি ফিরেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ১০ দশমিক ৭ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরে ছিল মাত্র ২ দশমিক ৪৪ শতাংশ। বিশেষ করে মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি বেড়েছে ১৫ দশমিক ১৯ শতাংশ।
এনআরবিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন প্রধানিয়া মনে করেন, আমদানির এই ধরন বেশ গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি বাড়লে তা দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির জন্য সহায়ক ভূমিকা রাখে। তিনি আরও বলেন, রেমিট্যান্স ও রিজার্ভ বৃদ্ধির ফলে বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য বেড়েছে, যার ফলে ব্যাংকগুলোর ডলার সংগ্রহের চাপ অনেক কমেছে। বৈদেশিক খাতের এই মজবুত অবস্থান আমদানির ব্যয় ও দায় পরিশোধের সক্ষমতা বাড়িয়ে দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, মুদ্রানীতির কঠোর পদক্ষেপ এবং বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থা বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা আনতে সহায়তা করেছে। গত আগস্ট মাসে আন্তব্যাংক লেনদেন পরিচালনার জন্য ‘ফরেন এক্সচেঞ্জ মার্কেট’ বা এফএক্সএম মডিউল চালু করা হয়েছে। এছাড়াও অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেনে বাড়তি সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে।
ভবিষ্যতেও এই ইতিবাচক ধারা বজায় রাখতে স্থিতিশীল বিনিময় হার বজায় রাখা, রেমিট্যান্স পাঠানোর সেবা আরও সহজীকরণ এবং বিদেশে দক্ষ কর্মসংস্থান বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।