দূরদূরান্ত থেকে ঢাকায় এসে পরীক্ষার কেন্দ্রে পৌঁছে চাকরিপ্রার্থীরা যখন জানতে পারেন প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে পরীক্ষা বাতিল বা স্থগিত হয়েছে, তখন তার চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক আর কিছু হতে পারে না। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষার ক্ষেত্রে সম্প্রতি এমন ঘটনা ঘটেছে। সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং নির্ভরযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এই ঘটনা।
দেশের শ্রমবাজারের ভারসাম্যহীনতার কারণে শিক্ষিত তরুণদের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। আইএমএফের ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ম্যাগাজিনের সেপ্টেম্বর সংস্করণের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি ১০০ জন শিক্ষিত তরুণের মধ্যে ৩৬ জনই বেকার। এই কঠিন বাস্তবতায় সরকারি চাকরির স্বপ্ন দেখা তরুণদের জন্য স্বাভাবিক। ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের মূলে ছিল সরকারি চাকরিতে বৈষম্য ও অনিয়মের প্রতিবাদ। সেই আন্দোলনের পর প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো পুরোনো ও জঘন্য চর্চা ফিরে আসা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের সূচনাই হয়েছিল সরকারি চাকরিতে অনিয়ম ও বৈষম্যের প্রতিবাদে। কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম বড় সংকট। বেসরকারি খাত অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হলেও দীর্ঘদিন ধরেই বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে পড়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সেভাবে বাড়ছে না। দেশের শ্রমবাজারের কথা চিন্তা না করে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিস্তার হওয়ায় শিক্ষিতদের জন্য শোভন চাকরি যেন সোনার হরিণ হয়ে উঠেছে।
যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার মাত্র ২৪২টি পদের বিপরীতে আবেদন করেছিলেন প্রায় ৩ লাখ ১৯ হাজার প্রার্থী। অর্থাৎ প্রতিটি পদের জন্য প্রায় ১ হাজার ৩১৮ জন প্রার্থীকে লড়াই করতে হচ্ছে। পরীক্ষা স্থগিত হওয়ার ফলে যেমন প্রার্থীরা আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তেমনি তীব্র ক্ষোভ থেকে তারা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদও জানিয়েছেন। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এ ঘটনায় পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তবে শুধুমাত্র কমিটি গঠনই যথেষ্ট নয়; যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরকেও এই দায়ভার নিতে হবে। তদন্ত হতে হবে নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য, যেখানে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি দায়িত্বে অবহেলাকারী কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করে তদন্তের ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করা জরুরি। একই সঙ্গে দায়িত্বে অবহেলা বা গাফিলতি থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহির মুখোমুখি করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এবারের ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া।
সব সরকারি চাকরির পরীক্ষা ঢাকাতেই আয়োজনের প্রথা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তিন লাখের বেশি প্রার্থীকে ঢাকায় ডেকে আনা শুধু রাজধানীর ওপরই চাপ সৃষ্টি করে না, বরং চাকরিপ্রার্থীদের যাতায়াত ও আবাসনের খরচ বাড়িয়ে দেয়। বিভাগীয় শহরে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করা হলে প্রার্থীরা যেমন অর্থ ও সময়ের সাশ্রয় পাবেন, তেমনি ঢাকার ওপর বাড়তি চাপ কমবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষার মতো চাকরির পরীক্ষাও বিভাগীয় পর্যায়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সব চাকরির পরীক্ষা কেন ঢাকাতেই হতে হবে, সেটা আমাদের কাছে বোধগম্য নয়।
নিয়োগ ব্যবস্থায় একটি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা হাজারো তরুণের আস্থা নষ্ট করে দেয়। তাই স্থগিত পরীক্ষাটি পুনরায় সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করার পাশাপাশি প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে। অনিয়মের উৎসগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করাই এখন রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব। সরকারি নিয়োগে মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।