দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের হার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মোট বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ২৪ হাজার। এর মধ্যে ৮ লাখ ৮৫ হাজারই স্নাতক ডিগ্রিধারী। অর্থাৎ প্রতি তিনজন বেকার ব্যক্তির একজন উচ্চশিক্ষিত। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝা যায় আট বছরের ব্যবধানের পরিসংখ্যান দেখলে—২০১৭ সালে স্নাতক বেকার ছিলেন প্রায় চার লাখ, যা বর্তমানে দ্বিগুণেরও বেশি। স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার এখন ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ, যেখানে ২০১০ সালে এই হার ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। দীর্ঘ সময় বেকার থাকার হারও বেশ উঁচুতে; চাকরিপ্রত্যাশী উচ্চশিক্ষিত তরুণদের ১৭ শতাংশের বেশি দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে কর্মহীন অবস্থায় রয়েছেন। বেকারত্বের আলোচনা সাধারণত চাকরির সংখ্যা ঘিরেই আবর্তিত হয়, তবে তথ্য-উপাত্তের গভীর বিশ্লেষণে এই সমস্যার তিনটি ভিন্ন স্তর স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যাঁরা কাজ খোঁজাই ছেড়ে দিয়েছেন, তাঁরা বেকারের হিসাব তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নয়। নতুন কাজ সৃষ্টি দীর্ঘমেয়াদি বিষয়।
বেকারত্বের সমস্যাকে কেবল চাকরির সংখ্যার সংকট হিসেবে দেখলে হবে না, এর পেছনে তিনটি মৌলিক কারণ বিদ্যমান। প্রথমত, দেশে কাজের তীব্র অভাব রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) হিসাবে প্রতিবছর সাত লাখের বেশি শিক্ষার্থী স্নাতক পাস করেন, অথচ বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক পরিবেশের সীমাবদ্ধতায় দেশ সর্বোচ্চ তিন লাখ স্নাতকের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে। বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ অনুযায়ী, গত ও চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসায় নিট নতুন কর্মসংস্থান হবে মাত্র ৬ লাখ ৩০ হাজার, যা নতুন স্নাতকদের সংখ্যার চেয়েও কম।
দ্বিতীয় কারণটি হলো দক্ষতার অমিল। সরকারের অর্থনৈতিক কৌশল পুনর্নির্ধারণ টাস্কফোর্সের প্রতিবেদন বলছে, স্নাতকধারীদের প্রায় ৬০ শতাংশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ থেকে পাস করা শিক্ষার্থী, যাঁদের বড় অংশ মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের। অন্যদিকে, নিয়োগকর্তারা হিসাব, বিক্রয়, তথ্য বিশ্লেষণ বা প্রযুক্তির মতো হাতে-কলমে দক্ষ জনবল খুঁজছেন। বিআইডিএসের গবেষণায় উঠে এসেছে, নিয়োগকর্তাদের প্রত্যাশিত দক্ষতার প্রায় ৩০ শতাংশ শ্রমবাজারে পাওয়া যায় না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রভাব, যা প্রথাগত কারিগরি পদের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে তরুণদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। কেন বাদ পড়লেন, তা-ও জানতে পারেন না।
তৃতীয় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে তথ্যের ঘাটতি ও সংযোগের অভাব। অনেক সময় নিয়োগকর্তারা উপযুক্ত প্রার্থী খুঁজে পান না বলে পরিচিতজনের সুপারিশের ওপর নির্ভর করেন, যা পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াকে সীমাবদ্ধ করে। চাকরিপ্রত্যাশীরাও কার্যকর তথ্যের অভাবে বিভ্রান্ত হন; আবেদন করেও কোনো সাড়া পান না। টাস্কফোর্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কর্মজীবীদের ৮৫ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করছেন, যেখানে কোনো নিয়োগপত্র বা সামাজিক সুরক্ষা নেই। এছাড়া ৬৪ থেকে ৬৭ লাখ মানুষ আংশিক বেকার, অর্থাৎ তাঁদের সময় বা দক্ষতার পূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে না। তৃতীয় সমস্যাটি হলো সংযোগের ঘাটতি ও তথ্যের অভাব, যার কারণে একটি পদের বিপরীতে বিপুল আবেদন জমা পড়লেও নিয়োগকর্তারা যোগ্য প্রার্থী পান না, বিশেষ করে মানবসম্পদ বিভাগ বা সুপরিচিত ব্র্যান্ড না থাকা ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো শত শত সিভি যাচাইয়ের লোকবল ও সময়ের অভাবে। সেখানে নিয়োগপত্র নেই, সামাজিক সুরক্ষাও নেই। সংযোগের ঘাটতি কমানো সে তুলনায় দ্রুত সম্ভব, আর এখানেই ডিজিটাল নিয়োগব্যবস্থা বদলে দিতে পারে এর চিত্র।
নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের চিত্রটিও বেশ হতাশাজনক। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, শিল্প ও সেবা খাতে চাকরি হারানো অনেক নারী কর্মক্ষেত্র থেকে পুরোপুরি সরে গেছেন। বিবিএসের হিসাবে, ২০২৪ সালে দেশের শ্রমশক্তি প্রায় ১৭ লাখ ৪০ হাজার কমেছে, যার মধ্যে ১৬ লাখ ৪০ হাজারই নারী। এছাড়া, শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণ—কোনোটির সঙ্গেই যুক্ত নেই এমন তরুণের সংখ্যা গত পাঁচ বছরে দ্বিগুণ হয়েছে।
এই সংকট নিরসনে ডিজিটাল নিয়োগব্যবস্থা ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে আকিজ রিসোর্স কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ক্যারিয়ার প্ল্যাটফর্ম ‘নেক্সটজবজ’ (nextjobz.com.bd) চালু করেছে, যা চাকরি খোঁজা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং লার্নিং ল্যাবের মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও নিয়োগকর্তাদের মধ্যে সংযোগ স্থাপনে কাজ করছে। তবে কেবল প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করলে চলবে না; স্মার্টফোন বা ইন্টারনেটের সুবিধা না থাকা চাকরিপ্রত্যাশীদের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। চূড়ান্ত মূল্যায়নে মানবিক বিচারবুদ্ধি অপরিহার্য। কোন প্রতিষ্ঠানে কী দক্ষতা লাগে, বেতন কত—এসব তথ্যও সহজে মেলে না।
দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। পাঠ্যক্রমে ইন্টার্নশিপ, ব্যবহারিক প্রকল্প এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেছে টাস্কফোর্স। একই সঙ্গে, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সফলতা কেবল সনদের সংখ্যার ভিত্তিতে নয়, বরং প্রশিক্ষণ শেষে কতজন কর্মসংস্থান পেলেন বা পেশাগত উন্নতি করলেন তার ভিত্তিতে পরিমাপ করা উচিত। সরকারকে ব্যাংক, রাজস্ব ও জ্বালানি খাতে সংস্কারের মাধ্যমে বিনিয়োগের পরিবেশ ফেরাতে হবে এবং শ্রমবাজারের নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ করতে হবে। নিয়োগ প্ল্যাটফর্মগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে প্রার্থীর তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং সহজবোধ্য আবেদনের সুযোগ তৈরি করার। নতুন কর্মসংস্থান তৈরি দীর্ঘ সময়ের বিষয় হলেও, বিদ্যমান চাকরির সুযোগগুলো যোগ্য প্রার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ এখনই নেওয়া জরুরি। লেখক: শোয়েব হাসান, চিফ বিজনেস অফিসার, নেক্সটজবজ লিমিটেড।