ইউরোপিয়ান সুপার লিগ (ইএসএল) চালুর যে উদ্যোগ সাড়ে পাঁচ বছর আগে ফুটবল অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল, তা আবার নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। টুর্নামেন্টটি আলোর মুখ না দেখলেও প্রাথমিক প্রস্তুতি ও প্রশাসনিক কাজে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছিল। সেই খরচের দায়ভার এড়াতে পারে না উল্লেখ করে এবার প্রিমিয়ার লিগের ছয়টি ক্লাবের কাছে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে রিয়াল মাদ্রিদ।
২০২১ সালের এপ্রিলে উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের প্রভাব কমিয়ে নিজেদের বাণিজ্যিক লাভ ও আর্থিক ভিত শক্ত করতে ইউরোপের ১২টি শীর্ষ ক্লাব এক হয়ে নতুন এই সুপার লিগ আয়োজনের পরিকল্পনা সামনে আনে। তবে এ ঘোষণার পর ইউরোপজুড়ে তুমুল বিতর্ক ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়। উয়েফা ও ফিফার হুশিয়ারির পাশাপাশি সমর্থক, সাবেক ফুটবলার ও কোচেরা একযোগে প্রতিবাদ জানান। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে স্টেডিয়ামের সামনে সমর্থকদের জোর আন্দোলনের মুখে মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সুপার লিগ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় আর্সেনাল, চেলসি, লিভারপুল, ম্যানচেস্টার সিটি, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও টটেনহ্যাম হটস্পার। ২০২১ সালের এপ্রিলে ইউরোপের প্রভাবশালী ১২ ক্লাব উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের একচ্ছত্র আধিপত্য ভেঙে নতুন এক সুপার লিগ আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছিল। ১২ প্রতিষ্ঠাতা ক্লাবের মধ্যে ৯টিই বিদায় নেওয়ায় সুপার লিগ গঠনের স্বপ্ন অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়। ইউরোপের অভিজাত ক্লাবগুলোকে নিয়ে গড়া এ টুর্নামেন্টের মূল লক্ষ্য ছিল ব্যাপক বাণিজ্যিক লাভ ও নিজেদের আর্থিক ভিত্তি আরো মজবুত করা। উয়েফা ও ফিফার কড়া হুঁশিয়ারির সঙ্গে ফুটবলপ্রেমী, সাবেক তারকা ও কোচরা এ উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করেন। বিশেষ করে ইংল্যান্ডে এ প্রতিবাদ রূপ নেয় গণবিক্ষোভে।
ইংলিশ ক্লাবগুলোর বিদায়ের প্রভাব পড়ে অন্যদের ওপরও। তাদের দেখাদেখি ইতালির এসি মিলান ও ইন্টার মিলানের পাশাপাশি স্পেনের অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদও প্রকল্প ছাড়ার ঘোষণা দেয়। মোট ১২টি প্রতিষ্ঠাতা দলের মধ্যে ৯টিই একযোগে সরে যাওয়ায় লিগ আয়োজনের মূল পরিকল্পনা শুরুতেই হোঁচট খায়। পরে ইতালিয়ান ক্লাব জুভেন্টাস সরে যায় এবং চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বার্সেলোনাও নিজেদের গুটিয়ে নেয়। ফলে ১২টি দলের মধ্যে এখন কেবল রিয়াল মাদ্রিদই এই প্রকল্পের হাল ধরে রেখেছে। সমর্থক ও ক্লাবগুলোর তীব্র বিরোধিতায় আলোর মুখ দেখার আগেই ভেস্তে যাওয়া সে প্রকল্প নিয়ে আবারও শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা।
মাঠে খেলা না গড়ালেও এই প্রকল্পের প্রাথমিক প্রস্তুতিতে আইনি, প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক প্রক্রিয়ায় প্রায় আট কোটি ইউরো খরচ হয়। দ্য অ্যাথলেটিকের তথ্যানুযায়ী, এতদিন পর্যন্ত এ খরচের বড় অংশ বহন করে আসছিল রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা ও জুভেন্টাস। তবে রিয়ালের বক্তব্য হলো, পরবর্তী সময়ে টুর্নামেন্ট থেকে বেরিয়ে গেলেও প্রাথমিক পর্বের আর্থিক দায় থেকে বাকি ক্লাবগুলো নিজেদের মুক্ত দাবি করতে পারে না।
প্রতিটি প্রতিষ্ঠাতা ক্লাব ‘ইউরোপিয়ান সুপার লিগ কোম্পানি’ নামের প্রতিষ্ঠানে অংশীদারত্ব চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। রিয়ালের মতে, সেই চুক্তির শর্তাবলি ও যৌথ উদ্যোগের নিয়ম মেনে ইংলিশ ক্লাবগুলোর এই খরচের ভাগ দেওয়া উচিত। তবে এ বিষয়ে প্রিমিয়ার লিগের দলগুলো এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নীরব রয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স টটেনহ্যাম হটস্পারের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তারা কোনো বক্তব্য দেয়নি এবং অন্য পাঁচটি ক্লাবও মুখ খোলেনি। এছাড়া এসি মিলান, ইন্টার মিলান ও অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের কাছে একই ধরনের অর্থ দাবি করা হয়েছে কিনা, তা-ও স্পষ্টভাবে জানায়নি রিয়াল।
ইউরোপীয় ফুটবলের প্রশাসনিক সংস্থা উয়েফার সঙ্গে দীর্ঘ আইনি জটিলতার অবসান ঘটিয়ে সম্প্রতি একটি নীতিগত সমঝোতায় পৌঁছেছে রিয়াল মাদ্রিদ। উয়েফার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার এই সময়েই সুপার লিগের পুরোনো আর্থিক পাওনা নিয়ে রিয়ালের নতুন দাবি পুরো ফুটবল বিশ্বে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই হিসাব-নিকাশের জটিলতা শেষ পর্যন্ত আদালতের টেবিলে গড়ায় নাকি পারস্পরিক সমঝোতায় সমাধান হয়, তা এখনো দেখার বিষয়। কিন্তু ঘোষণা হতেই ফুটবল বিশ্বে নজিরবিহীন প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।