কোরবানি আল্লাহ তাআলার প্রতি আনুগত্য, আত্মত্যাগ ও তাকওয়ার এক মহান শিক্ষা। ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাঈল (আ.)-এর অবিস্মরণীয় কোরবানির স্মৃতিকে জীবন্ত রাখতেই মুসলিম উম্মাহ প্রতিবছর জিলহজের নির্ধারিত দিনগুলোতে কোরবানি আদায় করে থাকে।
আর কোরবানি সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব ইবাদত। তাই এর সময়, বিধান ও করণীয় সম্পর্কে শরিয়তে বিধি-বিধান বলে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতএব, তুমি তোমার রবের উদ্দেশে নামাজ আদায় করো এবং কোরবানি করো।’ (সুরা : কাওসার, আয়াত : ২)
তাই ১০ জিলহজের ফজর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক এমন প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন মুসলিম নর-নারীর ওপর কোরবানি ওয়াজিব।
(আল-মুহিতুল বুরহানি : ৮/৪৫৫, ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়া : ১৭/৪০৫)
কোরবানির গুরুত্ব সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘যার কোরবানি করার সামর্থ্য আছে অথচ সে কোরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়।’ (মুসনাদে আহমদ : ২/৩২১)
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় দশ বছর অবস্থান করেছেন এবং প্রতিবছরই কোরবানি করেছেন।’ (তিরমিজি : ১৪৪৯)
কোরবানির নির্ধারিত সময় হলো ১০ জিলহজ ঈদের নামাজের পর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত।
এই তিন দিনের মধ্যেই কোরবানি সম্পন্ন করতে হয়। তবে শরিয়তের দৃষ্টিতে প্রথম দিন কোরবানি করা সর্বোত্তম, এরপর দ্বিতীয় দিন এবং তারপর তৃতীয় দিন। (বাদায়েউস সানায়ে : ৪/১৯৮, ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া : ৫/২৯৫)
কেউ যদি নির্ধারিত এই তিন দিনের মধ্যে কোনো কারণে ওয়াজিব কোরবানি আদায় করতে না পারে, তাহলে তার করণীয় সম্পর্কে ফোকাহায়ে কেরাম শরিয়তের সুস্পষ্ট বিধান উল্লেখ করেছেন। যদি কোনো ব্যক্তি ওয়াজিব কোরবানির হকদার হওয়া সত্ত্বেও কোরবানির দিনগুলোতে কোরবানি করতে না পারে এবং সে আগে থেকে কোনো পশু ক্রয়ও না করে থাকে, তাহলে তার ওপর একটি কোরবানিযোগ্য ছাগলের সমপরিমাণ মূল্য সদকা করা ওয়াজিব হবে। কারণ কোরবানির সময় অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পর কোরবানির বিকল্প হিসেবে সদকার বিধান কার্যকর হয়। আর যদি সে কোরবানির উদ্দেশ্যে পশু ক্রয় করে থাকে, কিন্তু কোনো কারণে নির্ধারিত সময়ে কোরবানি দিতে না পারে, তাহলে সেই পশুটিকে জীবিত অবস্থায় আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সদকা করে দিতে হবে। (বাদায়েউস সানায়ে : ৪/২০৪, ফাতাওয়ায়ে কাজিখান : ৩/৩৪৫)
অতএব, কোনো কারণে যদি কোরবানি আদায় করা সম্ভব না হয়, তাহলে হতাশ না হয়ে শরিয়ত নির্দেশিত বিধান অনুযায়ী সদকা বা পশু দান করার মাধ্যমে দায়মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, আল্লাহ তাআলা বাহ্যিক আয়োজনের চেয়ে বান্দার আন্তরিকতা, ইখলাস ও তাকওয়াকেই অধিক মূল্য দেন। তাই কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা হলো—নিজের প্রবৃত্তি, অহংকার ও স্বার্থপরতাকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করা এবং তাঁর নির্দেশের সামনে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করা।