ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভবিষ্যৎ আলোচনা তেহরানের নির্ধারিত ‘লাল রেখা’ বা অবিচল নীতিগত অবস্থানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
সরকারি বার্তা সংস্থা আইআরএনএ শুক্রবার তার বক্তব্য প্রকাশ করে।
তেহরান থেকে এএফপি জানায়, কালিবাফ বলেন, ‘আলোচনার পূর্ববর্তী পথচলায় আমরা যেমন দেখিয়েছি, তেমনি নির্ধারিত শর্ত ও লাল রেখা মেনে চলতে এবং ইরানি জাতির স্বার্থ রক্ষায় আমরা অবিচল।’
তিনি আরও বলেন, ‘শত্রুপক্ষ যদি অতিরিক্ত কিছু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, তবে আমরা ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছি যে আমাদের আঙুল ট্রিগারের ওপর রয়েছে এবং শত্রুকে বিধ্বংসী জবাব দিতে আমাদের কোনো দ্বিধা হবে না’
গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া আঞ্চলিক যুদ্ধের অবসানে চলতি সপ্তাহে তেহরান ও ওয়াশিংটন একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করে।
কালিবাফের এ মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি জানিয়েছেন যে, এ বিষয়ে তার ‘ভিন্ন মত’ থাকলেও তিনি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির অনুমোদন দিয়েছেন। তবে তিনি তার ভিন্নমতের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বার্তায় খামেনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা মানেই শত্রুপক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি মেনে নেওয়া নয়।’
খামেনির বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেন, ইরানের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ‘দেশের সর্বোচ্চ স্বার্থ নিশ্চিত করতে’ এবং ‘মর্যাদাবান ইরানি জাতির অধিকার রক্ষায়’ কাজ করবে।
চুক্তিতে ইরানের পক্ষে স্বাক্ষরকারী প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, ইরান তার লাল রেখা মেনে চলবে এবং দেশের ‘মর্যাদা, সম্মান ও কর্তৃত্ব’ রক্ষায় অটল থাকবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। এর মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে ৬০ দিনের বিস্তারিত আলোচনার ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
তবে চূড়ান্ত সমঝোতার লক্ষ্যে আলোচনা কবে শুরু হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকা প্রথম বৈঠকটি স্থগিত করা হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ হবে, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর দুই মাস ধরে চলা মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে এবং তেহরান ৬০ দিনের জন্য ‘কোনো ধরনের ফি ছাড়া’ হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করবে।
এতে ইরান প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র সংগ্রহ বা উন্নয়ন করবে না। যদিও তেহরান দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে যে তারা কখনোই পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা করেনি।
তবে ইরানের রক্ষণশীল মহলের মধ্যে চুক্তি ও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য নিয়ে গভীর সংশয় দেখা দিয়েছে। তাদের কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত হওয়ার আগেই তেহরান হয়তো গুরুত্বপূর্ণ দর-কষাকষির উপায়গুলো হারাতে পারে।
অতিউগ্র রক্ষণশীল দৈনিক কায়হান-এর সম্পাদক হোসেইন শারিয়তমাদারি বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমেরিকানরা কোনো প্রতিশ্রুতিই রক্ষা করে না। তারা কোনো চুক্তির প্রতিই বিশ্বস্ত ছিল না এবং ভবিষ্যতেও থাকবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘হরমুজ প্রণালীই ক্ষতিপূরণ আদায়ের পথ।’
এদিকে, জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে সম্ভাব্য পরিদর্শনের খবরেও আপত্তি জানিয়েছেন পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়ি।
এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, ‘আমি আশা করি সরকার এ খবর অস্বীকার করবে। কিন্তু যদি এ দাবি সত্য হয়, তাহলে সংসদ এ ধরনের আইনভঙ্গ ও অবাধ্যতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে।’