মাঝেমধ্যে বৃষ্টির দেখা মিললেও পুরো মাসজুড়েই চলছে গ্রীষ্মের খরতাপ। এরই মধ্যে বছর ঘুরে দুয়ারে হাজির ঈদুল আজহা। এই সময়ে ভ্যাপসা গরমে কোরবানির পশু কিনতে হাটে যাওয়া থেকে শুরু করে অন্যান্য কেনাকাটা ও ঈদযাত্রায় শরীর দ্রুত কাহিল হয়। পানির তৃষ্ণাও লাগে বারবার। এ অবস্থায় এবছর হাঁসফাঁস গরমে ঈদ ঘিরে চাঙ্গা হতে পারে আইসক্রিমের বাজার।
এ খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, আইসক্রিমের ব্যবসার বড় অংশই গ্রীষ্মকালকেন্দ্রিক। দেশে এখন বছরে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার আইসক্রিম বিক্রি হয়। এরমধ্যে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার বিক্রি হয় শুধু মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত—এই চার মাসে।
অন্যদিকে, এবার মে মাসের শেষে আইসক্রিম ব্যবসার ভরা মৌসুমে পড়েছে ঈদুল আজহা। যে কারণে ঈদের কয়েক দিনেই অন্তত ৫০০ কোটি টাকারও বেশি ব্যবসার প্রত্যাশা করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। কারণ হিসেবে তারা এ-ও বলছেন, ঈদের মৌসুমে এমনিতেই বাংলাদেশে আইসক্রিমের বিক্রি ব্যাপক বাড়ে। তীব্র গরম ও উৎসবের আমেজে ব্র্যান্ডেড আইসক্রিম থেকে শুরু করে লোকাল কার্ট পর্যন্ত সব জায়গায় বেচাকেনা তুঙ্গে থাকে।
এমনিতেই প্রতিবছর এ খাতে প্রবৃদ্ধি ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে এ খাতে ব্যবসাও বাড়ছে। আগামী দু-তিন বছরের মধ্যে বিক্রি বেড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হতে পারে।—বলছেন খাত সংশ্লিষ্টরা
তবে তীব্র গরমে ভালো ব্যবসার প্রত্যাশার বিপরীতে বৃষ্টির বাগড়ার শঙ্কাও রয়েছে। কারণ, ভারী বৃষ্টি হলে বা তাপমাত্রা কিছুটা সহনীয় থাকলে আইসক্রিমের বিক্রি কমে যায়। গত বছর কোরবানি ঈদের সময় টানা বৃষ্টিতে বেচাকেনায় মন্দাভাব ছিল, সেবার প্রত্যাশা পূরণ হয়নি ব্যবসায়ীদের। এবারও তেমন হলে লাভের আশা হবে গুড়েবালি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, মূলত গরম যত বেশি, আইসক্রিমের ব্যবসাও তত ভালো। এরমধ্যে বৃষ্টি হলে একদম মন্দা নেমে আসে।
আইসক্রিম/ফাইল ছবি
দেশের আইসক্রিমের বাজারের দুই–তৃতীয়াংশ দখলে রেখেছে আব্দুল মোনেম গ্রুপের ইগলু। এ প্রতিষ্ঠানের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার সুমিত চক্রবর্তী জাগো নিউজকে বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবেই আমরা এবছরও ঈদে ভালো বিক্রির প্রত্যাশা করছি। তবে এবার কিন্তু পিক টাইমেও বৃষ্টি হচ্ছে। গত কয়েকদিনও বৃষ্টি ছিল। গত বছরও ঈদের আগের দিন, ঈদের দিন ও ঈদের পর দিন বৃষ্টি হয়েছিল। যে কারণে কেউই প্রত্যাশা অনুযায়ী ব্যবসা করতে পারেনি।’
ইগলুর পরেই বাজারে জনপ্রিয় ঢাকা আইসক্রিম ইন্ডাস্ট্রিজের পোলার ব্র্যান্ডের আইসক্রিম। এছাড়া সেভয়, লাভেলো, জা এন জি, কোয়ালিটি, বেলিসিমোসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে আইসক্রিমের বাজারে। পাশাপাশি প্রচুর প্রতিষ্ঠান, ফুড কার্ট, নিজস্ব দোকানেও আইসক্রিম তৈরি ও বিক্রি হয়।
আইসক্রিম/ফাইল ছবি
আইসক্রিম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, দেশে ভরা মৌসুমে প্রতিদিন ৬ থেকে ৭ লাখ লিটার আইসক্রিম বিক্রি হয়। এরমধ্যে বর্তমানে প্রতিদিন দেড় লাখ লিটারের বেশি আইসক্রিম উৎপাদন করছে ইগলু ব্র্যান্ড।
‘সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে এবছর ঈদে ভালো বিক্রি হবে। প্রতিটি কোম্পানি সেরকমই প্রত্যাশা করছে। প্রত্যেকেই কিন্তু ঈদ ঘিরে বাড়তি প্রস্তুতি রেখেছে’।—বলছেন সুমিত চক্রবর্তী
সুমিত চক্রবর্তী বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে বিক্রি কয়েকগুণ বাড়বে বলে আশা করছি। এছাড়া এ ঈদে দীর্ঘ ছুটি বিক্রি বাড়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।’
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমনিতেই প্রতিবছর এ খাতে প্রবৃদ্ধি ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে এ খাতে ব্যবসাও বাড়ছে। আগামী দু-তিন বছরের মধ্যে বিক্রি বেড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হতে পারে।
কোম্পানিগুলোর ব্যবসার পাশাপাশি রাজধানীসহ বিভিন্ন শহর এলাকায় ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে আইসক্রিম পারলার ও দোকান। যেখানে আইসক্রিমের পাশাপাশি কফি, জুসসহ নানান ধরনের পানীয় বিক্রি হয়।
ঢাকার মালিবাগ চৌধুরীপাড়া এলাকার তেমনই একটি দোকান ‘আইসক্রিম শপ’। সেখানকার বিক্রেতা মুহিব বিদেশ থেকে আমদানি করা কিছু মেশিনে নিজেই নানান পদের আইসক্রিম তৈরি করেন। জানতে চাইলে মুহিব বলেন, ‘মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে জুন-জুলাই পর্যন্ত আইসক্রিমের ব্যবসা তুঙ্গে থাকে। বৃষ্টি না হলে প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার শুধু আইসক্রিম বিক্রি হয়। তীব্র গরমে বিক্রি দ্বিগুণ বাড়ে।’
আইসক্রিম/ফাইল ছবি
‘গরমে মূলত আইসক্রিম বিক্রি বাড়ে। তবে বাংলাদেশে এখন শীত মৌসুমেও আইসক্রিমের চাহিদা থাকে’—যোগ করেন তিনি।
এদিকে, গত কিছুদিনের তীব্র গরমে ঢাকার পাড়া–মহল্লার দোকানগুলোতেও আইসক্রিম বিক্রি বেড়েছে। মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার কুমিল্লা স্টোরের ফরিদুল হক বলেন, ‘গত কয়েকদিন ধরে আইসক্রিমের প্রচুর চাহিদা দেখছি। যে কারণে ঈদের জন্য বাড়তি আইসক্রিমের অর্ডার দেওয়া রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘এখন প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকার আইসক্রিম বিক্রি হচ্ছে। ঈদের মধ্যে দিনে পাঁচ-ছয় হাজার টাকার আইসক্রিম বিক্রি হবে বলে ধারণা করছি।’