জন্মের পর থেকেই বাক্প্রতিবন্ধকতার শিকার সুমনা ম্রোং। ছোটবেলায় তাকে বাঁচিয়ে রাখতে মা নিয়তি ম্রোংয়ের লড়াই ছিল দীর্ঘ ও কঠিন। ময়মনসিংহের ধোবাউড়া সদরের বণিকপাড়ার এই তরুণী প্রতিকূলতাকে জয় করে আজ কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত। পড়াশোনা শেষে সুমনা এখন চাকরি করছেন এবং সংসারের হাল ধরেছেন। সুমনার মতে, একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির আত্মবিশ্বাস ও টিকে থাকার লড়াইয়ে পরিবারের সমর্থন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। পরিবার পাশে থাকলে বাইরের পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া সহজ হয়, অন্যথায় সমাজের অবহেলা ও কটুকথা মেনে এগিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব।
একই রকম সংগ্রামের গল্প ধোবাউড়ার চারুয়াপাড়া গ্রামের জামাল হোসেনের। ২০১২ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় পা হারিয়ে জীবন ও জীবিকায় অনিশ্চয়তায় পড়েন তিনি। ঢাকার কারওয়ান বাজারে ব্যবসা করা জামাল একসময় আত্মীয়স্বজনদের কাছে সাহায্যকারী হিসেবে সমাদৃত ছিলেন, কিন্তু দুর্ঘটনার পর মানুষ তার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এই অবহেলা তাকে দমাতে পারেনি। নিজের জমিতে কৃষিকাজ শুরু করে এবং স্ত্রীর অনুপ্রেরণায় স্থানীয় সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে শাকসবজির খামার গড়েন তিনি। বর্তমানে সবজি চাষ ও বিক্রির মাধ্যমে অর্জিত আয় দিয়ে তিনি দুই সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালাচ্ছেন।
শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও পরিবারের উৎসাহ ও সহমর্মিতায় ঘুরে দাঁড়িয়েছেন ধোবাউড়ার কলসিন্দুর গ্রামের যুবক রাজু শেখ। ছোটবেলায় বিয়ারিংয়ের গাড়িতে চলাফেরা করলেও, একটি বেসরকারি সংস্থার দেওয়া ট্রাইসাইকেল তার জীবনযাত্রায় গতি এনেছে। এখন নিজের দোকান পরিচালনা করে তিনি স্বাবলম্বী।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত প্রতিবন্ধীর সংখ্যা ৪০ লাখের কিছু বেশি। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান ও জীবনমান উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন জানান, শুধু চাকরি নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য নয়; বরং কর্মক্ষেত্রে সম-অধিকার ও প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি বলেন, ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩’ অনুযায়ী কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট ও প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, বাংলাদেশ জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন এবং নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট (এনডিডি সুরক্ষা ট্রাস্ট) থেকে এনজিওগুলোকে নিয়মিত আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে এবং এই সহায়তার হার বৃদ্ধির চেষ্টা চলছে। ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধীবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখার নির্দেশ রয়েছে।
সেন্টার ফর ডিজঅ্যাবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক নাজমুল বারী মনে করেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পণ্য উৎপাদন ও বিপণনের ক্ষেত্রে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। ব্যবসার কাঁচামাল সংগ্রহ ও পণ্য বাজারজাত করার জন্য তাঁদের উপযোগী পরিবহনব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
পরিশেষে, সুমনা ম্রোং মনে করেন সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি আশপাশের মানুষের একটুখানি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই একজন প্রতিবন্ধী মানুষের পুরো জীবন বদলে দিতে পারে। পরিবারের পাশে থাকার কারণেই তিনি সকল বাধা পেরিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পেরেছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ‘যেদিন সে জন্ম নিছে, সেদিন থেকে এমনি নরমালে খাইতে পারে নাই। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাক্প্রতিবন্ধী মেয়েকে বড় করতে গিয়ে দিনের পর দিন এভাবেই লড়াই করেছেন ময়মনসিংহের ধোবাউড়ার নিয়তি ম্রোং। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গত ৩১ জুলাই ধোবাউড়া সদরের বণিকপাড়ায় বসে মেয়েকে বড় করার লড়াইয়ের কথা বলছিলেন নিয়তি ম্রোং। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ছোটবেলায় স্কুলে গিয়ে পড়া বুঝতে পারলেও নিজের কথা শিক্ষককে বোঝাতে গেলেই তৈরি হতো সমস্যা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কথা বলার প্রতিবন্ধকতার কারণে পড়াশোনার পাশাপাশি সামাজিক নানা বাধার মুখেও পড়তে হয়েছে তাঁকে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মেয়ের হয়ে কথা বলেছেন, তাঁকে বুঝিয়েছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে এত দূর আসার পেছনে পরিবারের ভূমিকার কথাই বলেছেন সুমনা।