স্থানভিত্তিক ধানের নতুন জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন, আধুনিক ধানের জাত ও প্রযুক্তি কৃষক পর্যায়ে জনপ্রিয়করণ, এবং শস্যের নিবিড়তা বৃদ্ধিতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)-এর ‘স্থানভিত্তিক ধানের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং বিদ্যমান গবেষণার উন্নয়ন (এলএসটিডি)’ প্রকল্প। উপকূলীয় অঞ্চলের জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং উন্নত জাতের ধান ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়াই এই প্রকল্পের মূল ভিত্তি। তারই অংশ হিসেবে প্রকল্পের আওতায় স্থাপিত ব্রি আঞ্চলিক কার্যালয়, কক্সবাজারের উদ্যোগে রামু উপজেলার পশ্চিম চাকমারকুল ‘প্রযুক্তি গ্রামে’ স্থানীয় কৃষকদের মাঝে কৃষি উপকরণ বিতরণ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে ওই এলাকার ৬৬ জন কৃষকের মাঝে বিনামূল্যে সার, কীটনাশক ও সাইনবোর্ডসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ তুলে দেওয়া হয়।
প্রকল্পের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও লক্ষ্য নিয়ে এলএসটিডি প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. আনোয়ার হোসেন জানান, প্রযুক্তি গ্রামের মাধ্যমে ব্রি উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ধানের জাত ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি কৃষকের মাঠে কার্যকরভাবে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। কৃষকের উৎপাদনশীলতা ও আয় বৃদ্ধি, উৎপাদন খরচ হ্রাস এবং স্থানভিত্তিক টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। কৃষকের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও মাঠপর্যায়ে প্রযুক্তির যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে উপকূলীয় কৃষিতে এ উদ্যোগ একটি নতুন ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ব্রি আঞ্চলিক কার্যালয়, কক্সবাজারের সাইন্টিফিক অফিসার মোজাম্মেল হক তাঁর বক্তব্যে মাঠপর্যায়ে প্রযুক্তি সম্প্রসারণের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার ও উন্নত জাতের ধান চাষের মাধ্যমে কৃষকের উৎপাদনশীলতা ও আয় বহুগুণে বৃদ্ধি করা সম্ভব। এলএসটিডি প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকের কাছে সরাসরি গবেষণালব্ধ প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়াই তাদের মূল লক্ষ্য, যেন সাধারণ কৃষক এসবের সরাসরি সুফল ভোগ করতে পারে।
একই অনুষ্ঠানে ব্রি-এর সাইন্টিফিক অ্যাসিস্ট্যান্ট রাকিবুল ইসলাম প্রকল্পের কারিগরি ও মাঠপর্যায়ের সহায়তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি জানান, কৃষকদের হাতে শুধু সময়োপযোগী কৃষি উপকরণ তুলে দেওয়াই শেষ কথা নয়, বরং সঠিক মাত্রায় সার ও কীটনাশক ব্যবহার, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি সম্পর্কে নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এসব সঠিক দিকনির্দেশনার ফলে কৃষকের অনাকাঙ্ক্ষিত উৎপাদন খরচ অনেকটাই কমে আসবে এবং পাশাপাশি ধানের ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
অনুষ্ঠানে আগত অন্যান্য অতিথি ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অভিমত ব্যক্ত করেন যে, দেশের সার্বিক খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করতে গবেষণালব্ধ প্রযুক্তি ও কৃষকের মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটানো অত্যন্ত জরুরি। কৃষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তি ও সময়মতো উপকরণ সরবরাহ করা গেলে তারা প্রথাগত পদ্ধতির বদলে আধুনিক উপায়ে ধান চাষে আরও বেশি উৎসাহিত হবেন, যা সামগ্রিকভাবে পুরো এলাকার কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে এবং কৃষকের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিনামূল্যে মানসম্মত বীজ, সুষম সার ও কীটনাশকসহ আধুনিক চাষাবাদের পরামর্শ পেয়ে গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেছেন পশ্চিম চাকমারকুলের উপকারভোগী কৃষকেরা। তারা জানান, সঠিক সময়ে মাঠপর্যায়ে এ ধরনের সহায়তা ও বিশেষজ্ঞ পরামর্শ পাওয়ার ফলে ধান চাষ নিয়ে তাদের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। এই ধারাবাহিক কারিগরি সহযোগিতা বজায় থাকলে চলতি মৌসুমে ধানের রেকর্ড ফলন অর্জন সম্ভব হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।
এলএসটিডি প্রকল্পের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, প্রযুক্তি গ্রামের মাধ্যমে ব্রি উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ও জলবায়ু সহনশীল ধানের জাত এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়ার এই কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। কৃষকের উৎপাদন বৃদ্ধি, চাষাবাদ খরচ হ্রাস এবং পরিবেশবান্ধব টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এই প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।