নাগরিক হিসেবে কর প্রদান একটি দায়িত্ব এবং ইচ্ছাকৃতভাবে কর ফাঁকি দেওয়া আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কেউ যদি আয় গোপন করেন, সম্পদের ভুল তথ্য দেন কিংবা ভুয়া ব্যয় দেখিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করেন, তবে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া স্বাভাবিক। তবে আয়কর রিটার্নে কোনো ভুল পাওয়া গেলেই করদাতাকে সরাসরি ‘কর ফাঁকিদাতা’ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। কর কম পরিশোধ হওয়া এবং অসত্য তথ্য দিয়ে কর ফাঁকি দেওয়ার বিষয়টি সবসময় এক নয়।
করদাতা ও কর কর্তৃপক্ষের মধ্যে আয়যোগ্যতা, ব্যয়ের অনুমোদন কিংবা কর অব্যাহতির মতো বিষয়গুলো নিয়ে মতপার্থক্য থাকা অস্বাভাবিক নয়। এর ফলে করযোগ্য আয় বেড়ে অতিরিক্ত কর নির্ধারিত হতে পারে। কিন্তু অতিরিক্ত কর নির্ধারণ হলেই তা আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ২৭২ অনুযায়ী জরিমানার ভিত্তি তৈরি করে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ২০২৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর জারিকৃত ০৩/২০২৬ নম্বর আদেশে এই সীমারেখাটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছে।
ধারা ২৭২ মূলত আয় গোপন বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অসত্যভাবে প্রদর্শনের মাধ্যমে কর ফাঁকির ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ, করদাতা যদি আয়, সম্পদ, দায় বা ব্যয়ের ক্ষেত্রে কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করেন এবং এর ফলে সরকারের প্রাপ্য রাজস্ব কমে যায়, তখনই কেবল এই ধারা প্রয়োগের প্রশ্ন আসে। শুধু কর কম নির্ধারিত হয়েছে—এটি জরিমানার জন্য যথেষ্ট নয়। অসত্য তথ্য প্রদান এবং তার ফলে কর ফাঁকির বিষয়টি যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।
উদাহরণস্বরূপ, একজন চাকরিজীবীর প্রকৃত বার্ষিক আয় ৩০ লাখ টাকা হলেও তিনি যদি রিটার্নে ২০ লাখ টাকা দেখান এবং ব্যাংক হিসাব বা নিয়োগকর্তার নথিতে ৩০ লাখ টাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে অবশিষ্ট ১০ লাখ টাকা অপ্রদর্শিত আয় হিসেবে গণ্য হবে। এক্ষেত্রে কর কম পরিশোধ হওয়ায় ধারা ২৭২-এর অধীনে জরিমানার সুযোগ তৈরি হয়। অন্যদিকে, একই করদাতা পুরো ৩০ লাখ টাকা আয় দেখালেও যদি এর মধ্যে ৫ লাখ টাকা করমুক্ত বলে দাবি করেন এবং কর কর্তৃপক্ষ সেই দাবি নাকচ করে, তবে সেটি কর ফাঁকি নয়, বরং আইনের ব্যাখ্যা নিয়ে বিরোধ।
ব্যয়ের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। কোনো করদাতা যদি প্রকৃত ব্যয় রিটার্নে প্রকাশ করেন কিন্তু কর কর্তৃপক্ষ তা অনুমোদনযোগ্য নয় বলে সিদ্ধান্ত দেয়, তবে অতিরিক্ত কর নির্ধারিত হতে পারে, কিন্তু ব্যয়টিকে ভুয়া বলা যাবে না। অন্যদিকে, কোনো ব্যয় আদৌ না ঘটিয়ে ভুয়া চালান বা মিথ্যা হিসাবের মাধ্যমে তা দেখানো হলে সেটি কর ফাঁকির পর্যায়ে পড়ে। ধারা ২৭২ প্রয়োগের ক্ষেত্রে এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যবসার ক্ষেত্রেও বিক্রয় বা আয়ের হিসাব নিয়ে বিরোধ থাকলে তা কর নির্ধারণসংক্রান্ত বিষয় হিসেবে বিবেচিত হবে। কিন্তু যদি ব্যাংক হিসাব বা মূসক তথ্যের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে প্রকৃত বিক্রয় ঘোষিত বিক্রয়ের চেয়ে বেশি, তবেই কর ফাঁকির প্রশ্ন আসবে। ধারা ২৭২-এর অধীনে জরিমানার সূত্র হলো: জরিমানা = ফাঁকি দেওয়া অঙ্ক × ১০% × করবর্ষের সংখ্যা। এখানে ‘ফাঁকি দেওয়া অঙ্ক’ বলতে সঠিক তথ্য দিলে যে কর পরিশোধ করতে হতো এবং বাস্তবে যা পরিশোধ করা হয়েছে, তার পার্থক্যকে বোঝানো হয়েছে।
এনবিআরের আদেশের অন্যতম মূল ভিত্তি হলো গ্রহণযোগ্য দালিলিক প্রমাণ। শুধু কর কর্মকর্তার অনুমান বা প্রাক্কলনের ভিত্তিতে জরিমানা আরোপ করা যাবে না। যেমন, কোনো করদাতার বাড়ির মূল্য ২ কোটি টাকা দেখানো হলে কর কর্মকর্তা যদি তা ৩ কোটি টাকা মনে করেন, তবে তার স্বপক্ষে মূল্যায়ন প্রতিবেদন বা নির্ভরযোগ্য দলিল থাকতে হবে। শুধু অনুমানের ভিত্তিতে সম্পদের মূল্য গোপন করা হয়েছে বলে রায় দেওয়া যাবে না।
ধারা ২৭২ প্রয়োগের আগে কর কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করতে হবে যে, করদাতা কী তথ্য দিয়েছেন, সঠিক তথ্য কী, পার্থক্যের কারণ কী এবং এর ফলে কত টাকা কর ফাঁকি হয়েছে। জরিমানার মতো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আগে করদাতাকে শুনানির যুক্তিসংগত সুযোগ দেওয়া বাধ্যতামূলক।
এই নির্দেশনার উদ্দেশ্য প্রকৃত কর ফাঁকি এবং সাধারণ মতপার্থক্যের মধ্যে একটি স্পষ্ট সীমারেখা টানা। কোনো কর নির্ধারণে অতিরিক্ত কর এলে প্রথমেই যাচাই করতে হবে—আয় গোপন করা হয়েছে, নাকি করমুক্তির দাবি গ্রহণ করা হয়নি? ব্যয়টি ভুয়া ছিল, নাকি আইন অনুযায়ী অনুমোদনযোগ্য ছিল না? সম্পদের তথ্য ভুল ছিল, নাকি এর মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি নিয়ে বিরোধ ছিল? এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে জরিমানার বিষয়টি।
উল্লেখ্য যে, কর সংক্রান্ত বিভিন্ন জটিলতার বাইরেও বর্তমানে নানা সামাজিক ও প্রশাসনিক বিষয় আলোচনায় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পুলিশের চাকরিতে মানসিক চাপের কারণে সাড়ে ৭ বছরে ৭৫ জনের আত্মহত্যার ঘটনা, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পদবির আগে ‘মহামান্য’ ও ‘মাননীয়’ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা এবং আন্দারমানিক নদীতে ৪০ ফুট লম্বা মৃত তিমি পাওয়ার মতো ঘটনা। এছাড়া ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়েও গবেষকদের উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আয় গোপনে জরিমানা হওয়া উচিত প্রমাণসাপেক্ষে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিক মানুষের জীবন নিয়ে খেলছে, কেন বললেন গবেষক। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ২০২৬ সালের ২ সেপ্টেম্বরের আদেশ নং ০৩/২০২৬-এ এই সীমারেখাটি স্পষ্ট করা হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিরোধটি আয়ের অস্তিত্ব নিয়ে নয়, বরং আইনের প্রয়োগ নিয়ে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পরে ব্যাংক হিসাব, মূসক-সংক্রান্ত তথ্য, বিক্রয় চালান বা ক্রেতার হিসাব থেকে যদি প্রমাণিত হয় যে, প্রকৃত বিক্রয় ছিল ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং ৫০ লাখ টাকা গোপন করা হয়েছে, তাহলে কর ফাঁকির প্রশ্ন আসতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: করবর্ষের সংখ্যা গণনা করা হবে, যে করবর্ষে ফাঁকি সংঘটিত হয়েছে, সেই বছর থেকে যে করবর্ষে বিষয়টি উদঘাটিত হয়েছে, সেই বছরসহ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যেমন: অসত্য বা গোপন তথ্যের কারণে ২ লাখ টাকা কর ফাঁকি হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট করবর্ষের সংখ্যা তিন হলে জরিমানা হবে ৬০ হাজার টাকা।