ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধাবস্থা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের অস্থিরতার মধ্যেই চীন সফর করেছেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি। গত সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) থেকে শুরু হওয়া দুই দিনের এই সফরকে বেইজিং ও দোহা উভয়ই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে। চীনা কর্মকর্তাদের মতে, এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন এক ‘স্বর্ণযুগে’ প্রবেশের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কাতারকে চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে। সফর শেষে উভয় পক্ষ জ্বালানি, বিনিয়োগ এবং উন্নত প্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহযোগিতা আরও জোরদার করার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। তবে অর্থনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি ইরান-ইসরায়েল সংঘাত এবং তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে মধ্যস্থতার বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিডিয়া ও যোগাযোগ বিভাগের পরিচালক ইব্রাহিম বিন সুলতান আল-হাশমি গত মঙ্গলবার দোহায় সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমানের যুদ্ধ ও শান্তির মাঝামাঝি এই অনিশ্চিত পরিস্থিতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি উল্লেখ করেন, এই অস্থিরতা সাধারণ মানুষের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনছে না। তাই কাতার তার অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে সংকট নিরসনে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও নতুন নতুন কৌশল নিয়ে কাজ করছে।
হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা চীন ও কাতার উভয়ের জন্যই বড় উদ্বেগের কারণ। বিশ্বের মোট তেল ও এলএনজি পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে হয়। কাতার বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ এলএনজি রপ্তানিকারক এবং চীন বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক হওয়ায় এই নৌপথের নিরাপত্তা তাদের অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও কাতার চীনকে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা দিয়েছে।
জ্বালানি খাতই মূলত চীন-কাতার সম্পর্কের মূল ভিত্তি। গত বছর দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ২৩৮০ কোটি ডলার বা ২৩.৮ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে কাতার চীনকে ১ কোটি ৯৪ লাখ টন এলএনজি সরবরাহ করেছে, যা দেশটিকে চীনের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি সরবরাহকারীতে পরিণত করেছে। এছাড়া কাতারএনার্জি চীনের সিএনপিসি ও সিনোপেকের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী ২৭ বছরের চুক্তি স্বাক্ষর করেছে এবং নর্থ ফিল্ড গ্যাস প্রকল্পে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো অংশীদার হিসেবে কাজ করছে।
ইরান ইস্যুতে দুই দেশের কৌশলে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। চীন সরাসরি তেহরানের সমালোচনা এড়িয়ে সংঘাতের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করে আসছে। অন্যদিকে, ইরান কর্তৃক নিজের ভূখণ্ড ও প্রতিবেশী রাষ্ট্র আক্রান্ত হওয়ায় কাতার প্রকাশ্যে তেহরানের নিন্দা জানিয়েছে। তবে চীন ও কাতার উভয়ই মনে করে, সামরিক শক্তি নয়, বরং সংলাপই সংকট সমাধানের একমাত্র পথ। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই কাতারের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে কূটনৈতিক সমাধানের ওপরই জোর দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাতারের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা ও সামরিক অংশীদারত্ব রয়েছে, বিশেষ করে আল উদেইদ সামরিক ঘাঁটির কারণে। গত ৩ মার্চ ইরান থেকে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আল উদেইদে আঘাত হানার পর দোহা ওয়াশিংটনের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। তবে চীন যুক্তরাষ্ট্রের স্থলাভিষিক্ত হয়ে কাতারের নিরাপত্তার প্রধান নিশ্চয়তাদাতা হতে আগ্রহী নয়; বরং তারা নিজেদের একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।
সফরে শুধু ইরান সংকট নয়, বরং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বিস্তৃত করার বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং ঐতিহ্যবাহী ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি, অবকাঠামো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অর্থ খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। কাতারের প্রধানমন্ত্রী আল থানিও উচ্চপ্রযুক্তি ও উন্নত উৎপাদন খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন।
বর্তমানে কাতারে ৫২০টি চীনা কোম্পানি সক্রিয় রয়েছে। ইনভেস্ট কাতারের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে এসব কোম্পানির বিনিয়োগ প্রকল্পের মূল্য ৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে এবং এর মাধ্যমে ৩ হাজার ২০০টির বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। সব মিলিয়ে, ইরান সংকট ও আঞ্চলিক অস্থিরতা চীন-কাতার সম্পর্ককে আরও গভীর করার একটি নতুন প্রণোদনা হিসেবে কাজ করছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চীনও দোহাকে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে যোগাযোগ ও সমন্বয় বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একই সময়ে কাতার চীনকে জানিয়েছে, নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তারা জ্বালানি সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: হরমুজ প্রণালির অস্থিরতায় কেন ঝুঁকি বাড়ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা দুই দেশের অর্থনীতিতেই বড় প্রভাব ফেলতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চীন ও কাতারের স্বার্থের বড় একটি জায়গায় মিল থাকলেও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদের কৌশলে পার্থক্য রয়েছে।