শরৎকালের বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যায় চাঁদের আলোয় উদ্ভাসিত হলো চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার পার্বতীপুর ইউনিয়নের শেরপুর গ্রাম। শুক্রবার সন্ধ্যায় শেরপুর গ্রামের আখড়ায় ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ওঁরাও সম্প্রদায়ের আয়োজনে পালিত হলো ‘রাইজ কারাম’ উৎসব। ভাদ্রের পূর্ণিমায় জিতিয়ার পর আশ্বিন মাসের এই বিশেষ কারাম উৎসব ঘিরে গ্রামজুড়ে ছিল উৎসবের আমেজ। সন্ধ্যার দিকে গ্রাম থেকে নির্বাচিত কিশোররা পাশের এলাকা থেকে কারামের তিনটি ছোট ডাল কেটে নিয়ে আসেন। মাদলের তালে নেচে-গেয়ে আনন্দঘন পরিবেশে সেই ডালগুলো গ্রামে এনে আখড়ায় রোপণ করা হয়, যার চারপাশ ঘিরে আঁকা হয় আলপনা। এরপর শুরু হয় ঐতিহ্যবাহী পূজা-অর্চনা। গ্রামের নারী-পুরুষদের সঙ্গে নিয়ে কারাম ডালকে বরণ করে তারা গ্রামের আখড়ায় নিয়ে যাবে। ওঁরাওদের ভাষায় এ কারাম হচ্ছে ‘রাইজ কারাম’। ডালপূজার আনুষ্ঠানিকতা সেরে রাতভর নেচেগেয়ে মাতোয়ারা হয়ে কারামের আনন্দে ভাসে গ্রামের নারী-পুরুষ ও শিশুরা। কারামের ধর্মীয় সব আচার অনুষ্ঠান মিনতিরা ঠিকঠাকভাবে হয়তো করতে পারে না।
এই কারাম উৎসবকে ঘিরে দীর্ঘদিনের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনার মূল উদ্যোগ নিয়েছেন গৃহবধূ মিনতি বাকলা। বর্তমানে মিনতি পার্শ্ববর্তী ঠেকাপাড়া গ্রাম থেকে এসে তাঁর শ্বশুরবাড়িতে এই উৎসবের আয়োজন করছেন, যা গত তিন বছর ধরে নিয়মিত চলছে। শুরুর দিকে গ্রামের সব পরিবার এতে অংশ না নিলেও বর্তমানে শেরপুরের পাশাপাশি কোঠাডাঙ্গা, খারিপাড়া, জিনারপুর, দামকুড়া, হরিপুর, ধর্মপুর ও জামালপুরের মানুষের অংশগ্রহণে এই উৎসব সম্প্রীতির এক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। নিজের স্বপ্ন পূরণের আনন্দ প্রকাশ করে মিনতি বলেন, মানুষে মানুষে মিলেমিশে থাকাই কাম্য। সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণে এই উৎসব আর কখনো বন্ধ হবে না বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। কারাম গ্রামের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি বন্ধন যেমন মজবুত করেছে, তেমনি অন্য গ্রামের মানুষের সঙ্গে এ গ্রামের মানুষের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মিনতি বাকলা বলেন, ‘হামনিতো এইই চাহিলা।
উৎসবের বিভিন্ন ধরণ সম্পর্কে রাজশাহী থেকে আগত ওঁরাও নেতা ও এনসিটিবির সাদরি ভাষার পুস্তক প্রণয়নকারী বঙ্গপাল সরদার জানান, সাধারণত তিন ধরণের কারাম পালিত হয়। এর মধ্যে ভাদ্রের পূর্ণিমারটি ‘জিতিয়া কারাম’, আশ্বিনেরটি ‘রাইজ কারাম’ এবং দুর্গাপূজার দশমীরটি ‘দাশাই কারাম’ হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদরিভাষী শিক্ষার্থীরাও ক্যাম্পাসে নিজস্ব শেকড়ের সন্ধানে কারাম উৎসব পালন করছেন। প্রকৃতির সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠা কৃষিজীবী ওঁরাওসহ সাদরিভাষী জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা কৃষি ও প্রকৃতির কল্যাণে এই উৎসবের আয়োজন করে থাকেন। মানুষকের সাথ মানুষ মিলজুলকে রাহিবে।
তবে এবারের আয়োজনে কিছু ভিন্নতা লক্ষ্য করেছেন বঙ্গপাল সরদার। সাধারণত কুমারী মেয়েরা উপোস থেকে এই আচারের প্রধান অংশ পালন করলেও শেরপুরে তিনজন কিশোরীকে সহায়তা করেছেন তিনজন কিশোর, যাদের মধ্যে দুইজন সাঁওতাল সম্প্রদায়ের। এছাড়া আয়োজক মিনতি বাকলার জায়েরাও এতে উপোস পালন করেছেন। এই অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রগতিশীল চিন্তার প্রশংসা করে বঙ্গপাল সরদার বলেন, প্রথাগত আচারের বাইরে গিয়েও যেভাবে সবাই মিলে উৎসবটি সফল করেছেন, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। উপোস থাকা তিন কিশোরী সুচিতা কিসপটটা, সুনিতা তিগগ্যা ও পূজা টুডু দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে গ্রামের শিশুদের নিয়ে উৎসবটিকে পূর্ণতা দিয়েছেন। কিন্তু এখানে দেখলাম, তিনজন কিশোরীর সঙ্গে তিনজন কিশোর উপোস করেছে।