কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে জাতিসংঘের অধীনে একটি আন্তর্জাতিক কাঠামো গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে সিঙ্গাপুর। ২৬ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণান এই গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, এআই প্রযুক্তির ঝুঁকি কোনো নির্দিষ্ট দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়, তাই এই প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহারের স্বার্থে বিশ্বজুড়ে অভিন্ন নিয়মনীতি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এআই প্রযুক্তির বিকাশ এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এআইকে বাদ দেওয়ার আহ্বান বাস্তবসম্মত নয়।
বক্তব্যে বালাকৃষ্ণান ‘ইউএন ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন এআই সেফগার্ডস’ শীর্ষক একটি কাঠামোগত আন্তর্জাতিক চুক্তির ধারণা দেন। তিনি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার জন্য জাতিসংঘের বিদ্যমান কাঠামোগত উদ্যোগের সঙ্গে এর তুলনা করেন। তার মতে, এআইয়ের মৌলিক নীতিমালা নির্ধারণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তি তৈরিতে এমন চুক্তি সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
বালাকৃষ্ণান বলেন, বর্তমান বিশ্বে এআই প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের কারণে একে পুরোপুরি বর্জন করা আর সম্ভব নয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো দেশগুলোর বিপুল বিনিয়োগ ও তীব্র প্রতিযোগিতা এই খাতের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করছে। তবে প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও সমানতালে শক্তিশালী করা আবশ্যক। বিশেষ করে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ হারানো, জৈব অস্ত্রসহ ধ্বংসাত্মক প্রযুক্তি তৈরিতে এআইয়ের অপব্যবহার এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার মতো ঝুঁকিগুলো তিনি সতর্কতার সঙ্গে তুলে ধরেন। কোনো উন্নত এআই ব্যবস্থা ব্যবহারের আগে যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে মানুষের জরুরি হস্তক্ষেপের সুযোগ রাখার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
এআই নিয়ন্ত্রণে নতুন কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গঠনের সম্ভাবনার কথাও তার কণ্ঠে উঠে আসে। তিনি আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন কিংবা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মতো প্রতিষ্ঠানের আদলে একটি বৈশ্বিক তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলার পক্ষে মত দেন। চলতি সপ্তাহে সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের ২০টিরও বেশি দেশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ফ্রন্টিয়ার এআই মডেলের তদারকি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পক্ষে একটি যৌথ ঘোষণায় স্বাক্ষর করেছে। এই ঘোষণায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও যাচাইকরণ পদ্ধতির গুরুত্বের বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। একই সময়ে দুই দেশ এআই নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনাও চালিয়ে যাচ্ছে।
যদিও বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দুই এআই শক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এই যৌথ ঘোষণা থেকে দূরে রয়েছে, তবুও তারা এআই নিরাপত্তা নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনায় সরব রয়েছে। সিঙ্গাপুরের এই প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য প্রযুক্তি উন্নয়ন থামিয়ে দেওয়া নয়, বরং উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিধি প্রণয়ন করা। বালাকৃষ্ণানের ভাষায়, নতুন প্রযুক্তির জন্য সময়ের প্রয়োজনে নতুন নিয়ম ও প্রতিষ্ঠান তৈরি করা জরুরি, যাতে এআইয়ের সুফলের পাশাপাশি এর ঝুঁকিগুলোকেও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়।