ইরানের তরফ থেকে প্রস্তাবিত সাত দিনের যুদ্ধবিরতির পরিকল্পনা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই সিদ্ধান্তের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) এই খবরের প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৬ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির এই প্রবণতা বিশ্বজুড়ে নতুন করে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে।
জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ইরান প্রস্তাব করেছিল যে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে। বর্তমান বৈশ্বিক সরবরাহ সংকটের মুখে এই প্রণালিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে ট্রাম্প হোয়াইট হাউসের বাইরে সাংবাদিকদের কাছে স্পষ্ট করে বলেন, তিনি এই প্রস্তাব গ্রহণ করছেন না। ট্রাম্পের ভাষ্যমতে, ইরান একটি চুক্তি করতে আগ্রহী হলেও তারা যে শর্ত দিয়েছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমানের তুলনায় এক বছর আগে হয়তো এমন কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো সহজ ছিল, কিন্তু এখন ইরান নিজেদের অবস্থান আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর করে ফেলেছে।
তবে অ্যাক্সিওসকে দেওয়া আলাদা এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেননি। তিনি ইরানের সঙ্গে পুনরায় আলোচনার বিষয়ে ইতিবাচক প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সোমবার থেকেই পরোক্ষ আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইরান অবশ্য হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিনিময়ে তাদের জব্দ করা সম্পদ ফেরত, মার্কিন নৌ অবরোধের সমাপ্তি এবং তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো শর্তগুলোতে অটল রয়েছে।
ট্রাম্পের এই অনমনীয় অবস্থানের কারণে এশিয়ার শেয়ারবাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সোমবার দীর্ঘ ছুটির পর লেনদেন শুরু হলে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল শেয়ারবাজারের প্রধান সূচক দুই শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে। একই চিত্র দেখা গেছে টোকিও, সাংহাই, ম্যানিলা, ব্যাংকক ও জাকার্তার বাজারেও। বিপরীতে হংকং, সিডনি, সিঙ্গাপুর ও ওয়েলিংটনের বাজারে সূচক কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী ছিল।
বন্ডবাজারের অবস্থাও বেশ উদ্বেগজনক। ব্লুমবার্গের তথ্যানুযায়ী, গত সপ্তাহে বৈশ্বিক বন্ডের গড় সুদহার চার শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা ২০০৭ সালের পর সর্বোচ্চ। মূল্যস্ফীতির এই চাপে এখন বিনিয়োগকারীদের নজর মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের অক্টোবরের শেষ দিকে অনুষ্ঠেয় নীতিনির্ধারণী বৈঠকের দিকে। সিএমইর ফেডওয়াচ টুলের হিসাব অনুযায়ী, টানা দ্বিতীয়বার সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা ৬৫ শতাংশের বেশি। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে ফেডারেল রিজার্ভের পছন্দের মূল্যস্ফীতি সূচক এবং কর্মসংস্থান প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছেন নীতিনির্ধারকরা। ২০০৭ সালের পর এই প্রথম তা এতটা বেড়েছে।
কুইনটেক্স ইন্টেলের স্টিফেন ইনেস মন্তব্য করেছেন, ট্রাম্পের এই প্রত্যাখ্যানের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। তার মতে, বৈশ্বিক বন্ডবাজারে সাময়িক স্বস্তি দেখা দিলেও তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং এশিয়ার শেয়ারবাজার দুর্বল হয়ে পড়ায় অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। তবে ইনেস এখনও মনে করেন, শেষ পর্যন্ত সব পক্ষ আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার একটি সুযোগ তৈরি হতে পারে। লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ বৈশ্বিক জাহাজ চলাচলের এই জটিলতাকে আরও বহুমাত্রিক করে তুলেছে।