ইউক্রেনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে আগামী বছর প্রতিরক্ষা খাতে বিশাল বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে রাশিয়া। দেশটির পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে জমা দেওয়া খসড়া বাজেটে দেখা যায়, ২০২৭ সালে সামরিক খাতে রেকর্ড ১৭ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন রুবল বা প্রায় ২০৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি গত বছর একই সময়ের জন্য করা পূর্বাভাসের তুলনায় ২৬ শতাংশ বেশি। যুদ্ধের পঞ্চম বছর গড়িয়ে চলায় দুই পক্ষই দূরপাল্লার হামলা জোরদার করেছে, যার ফলে মস্কোর বাজেটের ওপর চাপ বাড়ছে। মস্কো প্রায় প্রতিদিনই কিয়েভে বিমান হামলা চালাচ্ছে। ২০২৮ ও ২০২৯ সালে প্রতিরক্ষা ব্যয় কমার পূর্বাভাস দেওয়া হলেও ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে রাশিয়া দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা ব্যয়ের পূর্বাভাস একাধিকবার ছাড়িয়ে গেছে।
বাজেট নথির তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট সরকারি ব্যয়ের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি এখন সামরিক খাতের দখলে। এমনকি স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক কল্যাণ খাতে সম্মিলিত যে বরাদ্দ রাখা হয়েছে, প্রতিরক্ষা ব্যয় তার চেয়েও বেশি। ইউরোপিয়ান পলিসি অ্যানালাইসিস সেন্টারের জ্যেষ্ঠ গবেষক আলেকজান্ডার কোলিয়ন্দ্রের মতে, প্রকাশিত এই অংকগুলো অর্থ মন্ত্রণালয় ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর প্রাথমিক আলোচনার ফসল। বাস্তবে এই ব্যয় আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি, কারণ সামরিক খাতের প্রকৃত ব্যয়ের বড় একটি অংশ সবসময় গোপন রাখা হয়। গ্রোজোভস্কি ভাষায়, যথেষ্ট অর্থ নেই। তার মতে, সরকার কার্যত সবাইকে একটি বার্তা দিচ্ছে- সরকারি বাজেট থেকে অর্থ পাওয়ার ওপর ভরসা না করাই ভালো; কারণ যাদের অর্থ দেওয়া একেবারেই জরুরি, মূলত তারাই বরাদ্দ পাবেন।
এদিকে, সামরিক খাতে বড় বরাদ্দ নিশ্চিত করতে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে মূল পরিকল্পনার চেয়ে ৫ শতাংশের বেশি বরাদ্দ হ্রাস করা হয়েছে। এমনকি ক্যানসারবিরোধী কর্মসূচির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতের বাজেট থেকে প্রায় ৯৭ শতাংশ অর্থ ছাঁটাই করার পরিকল্পনা রয়েছে। সামাজিক কর্মসূচির ক্ষেত্রেও ৬ শতাংশের বেশি বরাদ্দ কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বাজেট বিশ্লেষক ও কলামিস্ট বরিস গ্রজোভস্কি ‘ইমপরট্যান্ট স্টোরিজ’ পত্রিকায় লিখেছেন, সরকার বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন কমানোর পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়ন, বিশেষ করে সড়ক নির্মাণ ও উন্নয়ন খাতেও ব্যয় সংকোচনের পথ বেছে নিয়েছে। তিনি বলেন, সরকারি কোষাগারে পর্যাপ্ত অর্থের অভাব স্পষ্ট। বর্তমান পরিস্থিতি এমন একটি বার্তা দিচ্ছে যে, রাষ্ট্র এখন কেবল অত্যাবশ্যকীয় ক্ষেত্রগুলো ছাড়া অন্য কোথাও বড় কোনো আর্থিক সহায়তা দিতে সক্ষম নয়।
রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে সরকার কর বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। এর আওতায় সম্পত্তি বিক্রয় ও ব্যাংক আমানতের ওপর করের হার বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ২০২৭ সালে রাশিয়ার বাজেট ঘাটতি প্রায় ৫ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন রুবল বা ৬৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। গত বছর এই একই সময়ের জন্য যে ঘাটতির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, এটি তার চেয়ে ৭০ শতাংশ বেশি। গত বছর ২০২৭ সালের জন্য যে ৩ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন রুবল ঘাটতির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, নতুন হিসাব তার তুলনায় ৭০ শতাংশের বেশি।
নতুন এই হিসাব অনুযায়ী, ২০২৭ সালে সরকারের মোট ঋণ জিডিপির ২০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। যদিও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এই হার খুব বেশি নয়, তবুও রাশিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয় আগে যে মাত্রাকে ‘নিরাপদ’ বলেছিল, এটি তার চেয়েও বেশি। এ ছাড়া ২০২৭ সালে সরকারের ঋণ গ্রহণের পরিমাণ আগের প্রাথমিক পরিকল্পনার তুলনায় ৪৩ শতাংশ বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থমন্ত্রী আন্তন সিলুয়ানভ সম্প্রতি সামাজিক কল্যাণ ও প্রতিরক্ষা উভয় খাতকে অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করলেও, বাস্তব তথ্য বলছে সামরিক ব্যয়ই বর্তমান বাজেটের মূল চালিকাশক্তি।