রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত মা ও শিশুস্বাস্থ্য কেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে ভয়াবহ হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আরও তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন রাকিব আহমেদ সোহেল (৪৬), সারোয়ার আলম পিয়াস (৩৫) এবং সাজ্জাদ হোসেন মিশু ওরফে মোল্লা (৩৬)। তাঁদের মধ্যে দুজন ছাত্রদল ও একজন যুবদলের নেতা হিসেবে পরিচিত বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে। এ নিয়ে আলোচিত এ ঘটনায় গত ৯ দিনে মোট ১৯ জনকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হলো। গত ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। সবাই গোয়েন্দা নজরদারির মধ্যে রয়েছেন।
ডিবি পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ রাকিব জানান, হামলা ও ভাঙচুরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সুনির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণ পাওয়ার পর মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, হামলায় সম্পৃক্ত থাকায় অভিযুক্তরা গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে ছিলেন। ঘটনাস্থলে তাঁদের সশরীরে উপস্থিতির তথ্য নিশ্চিত হওয়ার পরই এই অভিযান চালানো হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে প্রায় দুই শতাধিক মুখোশধারী অস্ত্র নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ঢুকে নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে। হামলাকারীরা ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে পুরো স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয় এবং সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ টিকা, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম লুট করে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে একটি সংগঠনের সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দখল করার চেষ্টা চালানো হয়। এই ঘটনায় জড়িত অভিযোগে ওই সমিতির সম্পাদক শাহ আলম, অফিস সহকারী শাহাদাত এবং দুই সদস্য আতিকুর ও কামরুলকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙচুরে ব্যবহৃত এক্সক্যাভেটর বা ভেকু বহনকারী লোবেড গাড়ির চালক শহীদুল ইসলামকেও (৪০) আটক করেছে পুলিশ। স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় গতকাল পর্যন্ত গ্রেপ্তার ১৯ জনের মধ্যে পাঁচজন বিএনপি ও এর অঙ্গ–সহযোগী সংগঠনের সাবেক ও বর্তমান নেতা–কর্মী। ভবনের মেরামতকাজ চলছে,দরকার চিকিৎসা সরঞ্জাম।
হামলা ও লুটপাটের এই ঘটনায় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের স্থানীয় পর্যায়ের ১৪ নেতা-কর্মীকে বহিষ্কার করা হয়। যদিও দলীয় বিজ্ঞপ্তিতে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার বিষয়টি সরাসরি উল্লেখ না করে ‘শৃঙ্খলাবিরোধী ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের’ কারণ দেখানো হয়েছে। ঘটনার রেশ ধরে স্থানীয় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি পদত্যাগ করেন।
গ্রেপ্তারকৃতদের রাজনৈতিক পরিচয় পর্যালোচনায় দেখা গেছে, রাকিব আহমেদ শাহ আলী থানা যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক এবং সারোয়ার আলম ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের সহসভাপতি ছিলেন। অন্যদিকে, সাজ্জাদ হোসেন মিশু শাহ আলী থানা ছাত্রদলের সাবেক প্রতিষ্ঠাতা কমিটির সদস্য এবং নিজেকে জাতীয়তাবাদী সাইবার দলের ঢাকা জেলা শাখার সহসভাপতি হিসেবে পরিচয় দিতেন। এর আগে গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে সাইফুল ইসলাম খোকন শাহ আলী থানা বিএনপির সদস্য এবং মো. আলম শাহ আলী থানার ৮ নম্বর ওয়ার্ড শ্রমিক দলের সভাপতি হিসেবে পরিচিত। এছাড়া শাহ আলী থানা যুবদলের বহিষ্কৃত সভাপতি নূর আলমকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাকে চার বছর আগেই চাঁদাবাজির অভিযোগে সংগঠন থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে সাইফুল ইসলাম খোকন (৪৮) শাহ আলী থানা বিএনপির সদস্য এবং মো. আলম (৫৩) শাহ আলী থানার ৮ নম্বর ওয়ার্ড শ্রমিক দলের সভাপতি।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, ধৃত আসামিদের মধ্যে তিনজন শাহ আলী মাজার এলাকার ভাসমান তরুণ, যারা টাকার বিনিময়ে ধ্বংসাত্মক এই কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছিল। অপরাধের সাথে জড়িত আরও পাঁচজনের বিস্তারিত পরিচয় এখনও জানা যায়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, ইতিমধ্যে হামলার মূল নির্দেশদাতাদের শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাঁদের গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। জড়িতরা বর্তমানে আত্মগোপনে থাকলেও শিগগিরই তাঁদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।