ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ক্রমবর্ধমান ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি চরম অবনতির দিকে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বাধ্য হয়ে কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত ও বাঙ্কার-সুবিধাযুক্ত বিভিন্ন প্রাসাদে অবস্থান পরিবর্তন করছেন। তার নিরাপত্তায় নিয়োজিত রয়েছে বিশেষভাবে বাছাই করা একটি শক্তিশালী নিরাপত্তা দল।
মার্কিন দৈনিক দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্যের বরাতে ইসরায়েলভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেট জানিয়েছে, ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীটির একের পর এক হামলায় শুধু জনজীবন ব্যাহত হচ্ছে না, বরং দেশটির সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। যুবরাজের সর্বশেষ প্রকাশ্য উপস্থিতি দেখা গিয়েছিল মঙ্গলবার, যেদিন তিনি জাতীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে রক্তদান করেছিলেন।
সপ্তাহান্তে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি আঘাত হানে। ওই ভয়াবহ হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত ও কয়েক শ মানুষ আহত হয়েছেন। আহতদের অনেকের শারীরিক অবস্থা গুরুতর। ক্ষতিগ্রস্ত বিমানবন্দরের ছাদের অংশ ধসে পড়লে ২৮ বছর বয়সী এক মিসরীয় বিমানবালার হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তিনি মারা যান বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ২৮ বছর বয়সী এক মিসরীয় বিমানবালাও ছিলেন।
হামলার রেশ কাটতে না কাটতেই রোববার বিমানবন্দরটি বন্ধ থাকা অবস্থায় ফের ক্ষেপণাস্ত্র বা এর ধ্বংসাবশেষ আঘাত হানে। এর ফলে টার্মিনাল ৪-এ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে এবং আরও কয়েকজন আহত হন। আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দিয়ে প্রতিহত করার চেষ্টা চললেও বেসামরিক স্থাপনাগুলো আর নিরাপদ থাকছে না। বৃহস্পতিবার আকাশ থেকে পড়ে যাওয়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ একটি কিন্ডারগার্টেন ও চিকিৎসাকেন্দ্রে আঘাত হানে। বিস্ফোরণের শব্দে আতঙ্কিত বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হচ্ছে। শহরের আর্থিক অঞ্চলে কর্মরত ব্যক্তিদের পাশাপাশি কয়েকটি আন্তর্জাতিক স্কুলের শিক্ষার্থী ও কূটনীতিকদেরও ভবন ছেড়ে নিরাপদ স্থানে যেতে কিংবা আশ্রয় নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সৌদি কর্মকর্তারা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থার মজুত ফুরিয়ে আসা নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কৌশলগত সামরিক স্থাপনা থেকে শুরু করে রাজপ্রাসাদ ও জ্বালানি অবকাঠামো সুরক্ষিত রাখতে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে। হুতিরা সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনেও হামলা চালিয়েছে, যা লোহিত সাগর হয়ে তেল রপ্তানির পথকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। এই পাইপলাইনের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে লোহিত সাগর দিয়ে তেল রপ্তানি করতে পারে সৌদি আরব।
নিরাপত্তা সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে যুবরাজের ভিশন ২০৩০ কর্মসূচিতে। পর্যটন ও বিনিয়োগের বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে সৌদি আরবকে গড়ার পরিকল্পনা এবং নিওম মেগা প্রজেক্টসহ বড় বড় উন্নয়ন উদ্যোগগুলো এখন অনিশ্চয়তার মুখে। অক্টোবরের শেষ দিকে অনুষ্ঠেয় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলনটিও হামলার কারণে ঝুঁকির মুখে পড়েছে, কারণ বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দেশটিতে যাতায়াত ও নিরাপত্তা নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েছেন। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নিওমের মতো ভবিষ্যৎনির্ভর নগর প্রকল্প এবং রিয়াদে একাধিক বড় উন্নয়ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিমানবন্দর, তেল শোধনাগার ও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার কারণে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতির চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চলতি বছরের প্রথমার্ধে বিদেশি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে এবং বেশ কিছু বৃহৎ প্রকল্প স্থগিত বা পুনর্মূল্যায়নের আওতায় নিতে হয়েছে। সৌদি অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দেশটির অর্থনীতি ৩ দশমিক ৬ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, রোববারও হামলা অব্যাহত ছিল।
সামরিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুবরাজকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। ইয়েমেনে হুতিদের দমনে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পরামর্শ দিলেও সরাসরি সহায়তা দিতে ওয়াশিংটন এখনো রাজি হয়নি। তবে গত সপ্তাহান্তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, হুতিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি সৌদি আরবের সঙ্গে মিলে গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। বিমানবন্দরে হামলার পর ট্রাম্প মন্তব্য করেন, তারা যা করেছে তা খুবই নিন্দনীয়।
বর্তমান অস্থিরতা কাটাতে সৌদি আরব পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের কাছে সহায়তা চেয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জরুরি ভিত্তিতে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সংগ্রহের চেষ্টা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে সংঘাত কমাতে কূটনৈতিক সমাধানের পথও খোলা রেখেছে রিয়াদ। তবে রিয়াদের ভেতরে ক্ষেপণাস্ত্র পৌঁছানো এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাতের ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ভাবমূর্তিকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।