বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে চারটি নির্দিষ্ট খাতে বড় ধরনের সংস্কারের পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ। সংস্থাটির মতে, পরিবেশবান্ধব তৈরি পোশাকশিল্প, মধ্যবিত্তের আবাসন, রং ও রঞ্জক উৎপাদন এবং ডিজিটাল আর্থিক সেবায় বিনিয়োগের বাধাগুলো দূর করতে পারলে দেশে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। বুধবার (১৪ অক্টোবর) বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের বেসরকারি খাতের মূল্যায়ন প্রতিবেদনের তথ্যে এসব সম্ভাবনার কথা জানানো হয়।
ব্যাংককে আয়োজিত বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভার অংশ হিসেবে ‘আনলকিং ইনভেস্টমেন্ট ফর জবস’ শীর্ষক অনলাইন আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে সংস্থাটির বিশেষজ্ঞ সেবাস্তিয়াঁ বোয়াঁত্রো বক্তব্য রাখেন। আলোচনায় বাংলা ট্রিবিউনের বিজনেস এডিটর গোলাম মওলার এক প্রশ্নের উত্তরে বিশ্বব্যাংকের হিসাব তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়েছে, আবাসন খাতে বিনিয়োগ বাড়লে নির্মাণশিল্পে বছরে ২৩ লাখ ৭০ হাজার কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একইসাথে দেশীয় পর্যায়ে রং ও রঞ্জক উৎপাদনের প্রসার ঘটলে আরও ৬ লাখ ৬৪ হাজারের বেশি আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব। এছাড়া ডিজিটাল আর্থিক সেবার আধুনিকায়নে ৯৬ হাজার থেকে ৪ লাখ ৬০ হাজার পর্যন্ত নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কেবল অর্থায়ন বৃদ্ধি করলেই হবে না, বরং ব্যবসায়িক জটিলতা নিরসন এবং নীতিমালা সহজ করার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে এই সংস্কারগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখবে। কোনো প্রকল্পে আংশিক অর্থায়নের মাধ্যমে অন্য আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের যুক্ত করার চেষ্টা করে প্রতিষ্ঠানটি। এর মাধ্যমে বিনিয়োগের নিশ্চয়তাসংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা এক জায়গায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের আর্থিক খাতের দুর্বলতা কাটাতে ‘ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট–২’ প্রকল্পের আওতায় ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের একটি অর্থায়ন অনুমোদন করেছে বিশ্বব্যাংক। এই উদ্যোগের মাধ্যমে আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বাড়ানো এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠনে সহায়তা দেওয়া হবে। এর পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সংস্কার ও তারল্য সহায়তা কাঠামো উন্নয়নের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক খাতের সংস্কারে ৪৫০ মিলিয়ন ডলার।
এদিকে, বেসরকারি খাতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বাড়াতে বিশ্বব্যাংকের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। প্রকল্পের আংশিক অর্থায়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে আইএফসি ভূমিকা রাখছে, যা বিনিয়োগের ঝুঁকি হ্রাসে সহায়ক। তবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, ঋণঝুঁকি, মুদ্রার অস্থিরতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই ঝুঁকিগুলো মোকাবিলার লক্ষ্যে ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাংক একটি গ্যারান্টি প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে, যার মাধ্যমে বিনিয়োগের নিশ্চয়তাসংক্রান্ত সেবাগুলো একীভূত করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞের তথ্য মতে, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ সংগ্রহের জন্য সংস্থাটির সহায়তার পরিমাণ গত চার বছরে তিন গুণের বেশি বেড়েছে, যা ২০২৬ অর্থবছরে ১১২ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিশেষে, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা ও কার্যকর নীতিগত সংস্কারের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছে সংস্থাটি। তবে প্রতিবেদনে উল্লেখিত এই কর্মসংস্থানের হিসাব মূলত সম্ভাব্য প্রাক্কলন, যা বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও সংস্কার কার্যক্রমের যথাযথ বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে।