দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জনপদের বাসিন্দাদের সুপেয় পানির জন্য যে দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম, তার সঙ্গে সুন্দরবনের প্রতিবেশগত সংকটের যোগসূত্র অত্যন্ত গভীর। বছরের পর বছর সুন্দরবন রক্ষার কথা বলা হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগের অভাব রয়েই গেছে। বরং উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকা এবং বনের বাস্তুসংস্থানকে আলাদাভাবে দেখার প্রবণতা সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। সম্প্রতি খুলনার মোংলায় ‘উপকূলে পানির সংকট ও সুন্দরবনের প্রতিবেশ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এই সংকট উত্তরণে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করার সুপারিশ করা হয়েছে। বরং সুন্দরবন রক্ষা এবং উপকূলীয় মানুষের জীবন–জীবিকার সংগ্রামকে সামগ্রিক চোখে না দেখে বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবেই দেখে আসা হয়েছে। আলোচনায় সুন্দরবন রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো, বনব্যবস্থায় সংস্থাগুলোর দায়িত্ব সুস্পষ্ট করা, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানোর কথা বলা হয়। আমরা আশা করি, সরকার এই আলোচনা ও সুপারিশ যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবে এবং সুন্দরবনের প্রতিবেশ ও বন ঘিরে থাকা জনবসতির পানির সংকট সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ নেবে।
গবেষণা বলছে, সুন্দরবনের আশপাশে যত্রতত্র শিল্পকারখানা স্থাপনের ফলে বনের বাস্তুসংস্থান মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সিইজিআইএস এবং আরণ্যক ফাউন্ডেশনের যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে, সুন্দরবনের প্রতি ১০টি সুন্দরীগাছের মধ্যে প্রায় ৪টি বা ৩৯ শতাংশ গাছই এখন আগামরা বা টপ-ডাইং রোগে আক্রান্ত। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সুন্দরবনকে যদি তার স্বাভাবিক নিয়মে বাড়তে দিতে হয়, তবে বনকে বিরক্ত না করার নীতি কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে।
অন্যদিকে, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার মানুষের পানির সমস্যা কেবল লবণাক্ততার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের এমআইসিএস ২০২৫ জরিপে ভয়াবহ সব তথ্য উঠে এসেছে। জরিপ অনুযায়ী, খুলনা বিভাগের ৬৩ দশমিক ২ শতাংশ মানুষের ব্যবহৃত পানির উৎসে ই-কোলাই জীবাণুর উপস্থিতি রয়েছে। অবাক করার বিষয় হলো, ঘরে পানি পান করার সময় ৯২ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষের পানিতে এই ক্ষতিকর জীবাণু পাওয়া গেছে। এ ছাড়াও পানির উৎসে ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষের ক্ষেত্রে আর্সেনিকের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি। বর্তমানে উপকূলের মাত্র ১৮ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ নিরাপদ ব্যবস্থাপনার খাওয়ার পানির আওতায় রয়েছেন।
লবণাক্ততা বৃদ্ধির পেছনে গঙ্গা-গড়াই নদীব্যবস্থায় মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং বাণিজ্যিক চিংড়িঘেরের বিস্তার সরাসরি প্রভাব ফেলছে। মিঠাপানির উৎস ক্রমেই সংকুচিত হওয়ায় জনস্বাস্থ্যের ওপর বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর ফলে উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়ছে এবং নারীরা নানাবিধ স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। এমনকি গবেষণায় দেখা গেছে, স্থানীয়দের মধ্যে হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকিও মাঝারি থেকে উচ্চপর্যায়ে রয়েছে।
খুলনার মোংলার ওই আলোচনা সভায় শিক্ষক, গবেষক, স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবেশকর্মী ও সরকারি কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। তাদের দাবি, উপকূলের তিন জেলার মানুষের নিরাপদ পানির অধিকার নিশ্চিত করা এখন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। পুকুরের পানি পরিশোধন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদী অবকাঠামো নির্মাণে সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে বড় পরিসরে কাজ শুরু করার সময় এসেছে। স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এই ভয়াবহ পানির সংকট নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।