উপসাগরীয় দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর অবকাঠামোতে একের পর এক নিখুঁত ও সুনির্দিষ্ট হামলা চালিয়ে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়েছে ইরান এবং তেহরান সমর্থিত আঞ্চলিক মিত্ররা। তেল রপ্তানির সমুদ্রবন্দর, জ্বালানি পরিবহনের পাইপলাইন, গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, পানিশোধনাগার এবং বৃহদাকার শিল্পকারখানাকে লক্ষ্য করে চালানো এসব হামলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম ধ্বংস ও অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এতে করে চরমভাবে ব্যাহত হয়েছে জ্বালানি সরবরাহ ও রপ্তানি কার্যক্রম। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক চাঞ্চল্যকর ও বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। রয়টার্সের অনুসন্ধান অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ বোমা হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলের সাতটি দেশে অন্তত ৮৪টি অবকাঠামোগত স্থাপনায় ১৩৫টির বেশি মারাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরানি বাহিনী। এই আক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইন। এসব হামলার বেশ কয়েকটি সরাসরি চালিয়েছে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের স্বাধীনতাকামী হুথি বাহিনী এবং তেহরানের পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণাধীন ইরাকি শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো। তাঁদের ১৪ জনের সবাই বলেছেন, কয়েক ডজন বড় অবকাঠামোগত স্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতি মূলত আকাশ থেকে এলোমেলোভাবে পড়ে আসা ধ্বংসাবশেষের কারণে হয়েছে—এমন ব্যাখ্যা অত্যন্ত অসম্ভাব্য। ২০১৯ সালে প্রকাশিত ওই মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, ‘বেছে নেওয়া কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে হামলাই উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল স্থাপনাগুলোর বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে।’। রয়টার্সের প্রতিবেদনে আগের দিনের ব্রেন্টের সমাপনী মূল্য ব্যারেলপ্রতি ১০৬ ডলার বলা হয়েছে।
ঘন ঘন ও নিখুঁত সব ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় উপসাগরীয় দেশগুলোতে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে হু হু করে বেড়েছে অপরিশোধিত তেলের দাম। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের দীর্ঘদিনের অবরোধের পাশাপাশি বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি উৎপাদনকারী এই অঞ্চলে একের পর এক হামলায় বিশ্ব অর্থনীতিতেও তেহরানের প্রভাব আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। যুদ্ধের সময় উপসাগরীয় দেশগুলোর সরকার ও সংশ্লিষ্ট সামরিক বা বেসামরিক পক্ষগুলো এসব হামলার কথা বিভিন্ন সময়ে আংশিক জানালেও, মূল ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র ও গভীরতা প্রায় সব ক্ষেত্রেই ঢাকা পড়ে গেছে ব্যাপক গোপনীয়তার আড়ালে। অনেক লক্ষ্যবস্তুর প্রধান ভবন, মেঝের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বা পাইপলাইন ছাদ অথবা রোদ-বৃষ্টি থেকে সুরক্ষার জন্য নির্মিত কৃত্রিম আচ্ছাদনে ঢাকা থাকায় মহাকাশের উপগ্রহচিত্র থেকেও সহজে সব ধরনের দৃশ্যমান ধ্বংসস্তূপ বা আগুনের চিহ্ন সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং যুদ্ধের মধ্যে দমন-পীড়ন বাড়ার বিষয়টিও তুলে ধরেছে সংবাদমাধ্যমটি। হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত এই পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশ ঝুঁকিতে পড়ে। ফেব্রুয়ারিতে এই দাম ছিল প্রায় ৭০ ডলার।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, যুদ্ধের কারণে সরাসরি ঘটনাস্থলসমূহ পরিদর্শনের ভৌগোলিক সুযোগ না থাকায় সব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত কার্যকারিতা কিংবা সার্বিক ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ মাত্রা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত দেশগুলোর সরকারি দাবি অনুযায়ী, ইরানের শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র বা বিস্ফোরকবাহী ড্রোন আকাশেই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে সফলভাবে প্রতিহত করার পর, সেগুলোর ভারী ধ্বংসাবশেষ ও জ্বলন্ত সরাফ নিচে থাকা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ওপর পড়ে ক্ষয়ক্ষতি সংঘটিত করেছে। তবে রয়টার্সের এই অনুসন্ধানের ফলাফল বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনী বা মেরিন কোরের সাবেক বিশেষ অভিযানবিষয়ক বিমান হামলা বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনা ও দর-কষাকষিতেও এ পরিস্থিতি ইরানকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। হেলিকপ্টার থেকে সেগুলোকে আকাশেই ধ্বংস করার চেষ্টাও দেখেছি। এর মধ্যে একটি বা দুটি প্রতিরক্ষা ভেদ করে ঢুকে পড়েছিল।’। প্রতিরক্ষাবিষয়ক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান জেনস উপগ্রহচিত্রে ফুজাইরা বন্দরের প্রায় তিন কিলোমিটার উত্তরে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অবস্থান শনাক্ত করেছে। সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর বিবৃতি ও জ্বালানিবিষয়ক তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান আইআইআর এনার্জির মূল্যায়নে এ তথ্য উঠে এসেছে। ফুজাইরা বন্দরের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হয়েছিল ১৯৮৩ সালে। জ্বালানিবিষয়ক তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের রপ্তানি তথ্য অনুযায়ী, ১৬ মার্চ শুরু হওয়া সপ্তাহে বন্দরটি থেকে দৈনিক তেল রপ্তানির পরিমাণ কমে ৪ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেলে নেমে আসে। ২০২৫ সালে বন্দরটির দৈনিক গড় রপ্তানির তুলনায় তা অর্ধেকেরও কম। যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সন্ত্রাসবাদ দমনবিষয়ক নীতির সাবেক উপসহকারী মন্ত্রী থমাস ওয়ারিক বলেন, ইরানের কাছে তেলশিল্প সম্পর্কে জানেন—এমন অনেক লোক রয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পক্ষ থেকে ইরানের তেল রপ্তানির ওপর কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা হয়েছে এবং দেশটি যেন মধ্যপ্রাচ্যে ধ্বংসাত্মক হামলা চালানোর দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, সে লক্ষ্যে অব্যাহত সামরিক চাপ জোরদার করা হচ্ছে। তবে ওয়াশিংটনের কৌশল সত্ত্বেও তেহরান এবং তার মিত্রদের নিখুঁত আঘাত হানার সামর্থ্য প্রশ্নবিদ্ধ করছে সার্বিক মার্কিন যুদ্ধপরিকল্পনাকে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কেন্দ্রীয় কমান্ড বা সেন্টকমের মুখপাত্র নৌবাহিনীর প্রবীণ ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স বলেছেন, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে ইরানের ক্রমাগত সামরিক হুমকি ও আগ্রাসনের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে স্পষ্টভাবে তাদের অবস্থান জানিয়েছে।
ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স তার আনুষ্ঠানিক ভাষ্যে উল্লেখ করেন, গত সাত মাসে মধ্যপ্রাচ্যের দশের অধিক প্রতিবেশী স্বাধীন দেশ এবং শত শত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজকে সমুদ্রপথে নির্বিচার লক্ষ্যবস্তু করার জন্য ইরানের এই অস্থিতিশীল কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে, সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জাতিসংঘ কার্যালয়ে অবস্থানরত ইরানের কূটনৈতিক মিশন, যা মূলত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের যাবতীয় প্রশ্নের আনুষ্ঠানিক জবাব দেওয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত, তারা রয়টার্সের এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং সম্পর্কিত সুনির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর কোনো মন্তব্য করা থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত থেকেছে।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে এবং রয়টার্সের ভাষ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত অবকাঠামোয় ধারাবাহিক ও নিখুঁত হামলা চালানোর সক্ষমতা প্রদর্শন করে ইরান আবারও প্রমাণ করেছে যে, তারা ইচ্ছে করলেই এই অঞ্চলের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও বাণিজ্য পুরোপুরি অচল করে দিতে পারে। উপসাগরীয় অঞ্চলের কোনো কোনো স্পর্শকাতর স্থাপনায় প্রায় প্রতিদিন বা নিয়মিত বিরতিতে হামলা চালানো হয়েছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর শত শত বিলিয়ন ডলারের মারাত্মক অবকাঠামোগত মেরামত ব্যয় নিশ্চিত হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতি সাধিত হয়েছে।
ইরানি হামলায় চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর মধ্যে ভৌগোলিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দর। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর হরমুজ প্রণালির দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের প্রবেশদ্বারে অবস্থিত এই ফুজাইরা বন্দর বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বহনের জন্য অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি সামরিক সংঘাত ও যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ফুজাইরা বন্দর এলাকাকে লক্ষ্য করে অন্তত ১৯ বার মারাত্মক হামলা চালিয়েছে ইরানের ড্রোন ও দূরপাল্লার সামরিক ক্ষেপণাস্ত্র।
গত মার্চের মাঝামাঝি সময়ে ফুজাইরা বন্দরের ঠিক কাছেই অবস্থিত একটি মহাসড়ক থেকে সরেজমিনে সামরিক আক্রমণের ভয়াবহ দৃশ্য পর্যবেক্ষণ করেছিলেন এক প্রত্যক্ষদর্শী বিদেশি ব্যবসায়ী। রয়টার্সকে দেওয়া তার প্রত্যক্ষ বিবরণী অনুযায়ী, তিনি স্পষ্টভাবে আকাশে সারিবদ্ধভাবে ড্রোনগুলোকে উড়ে আসতে দেখছিলেন। ওই বিদেশি ব্যবসায়ী আরও বলেন, ‘তারা একটি দুটি করে নয়, বরং ঝাঁকে ঝাঁকে বিস্ফোরকবাহী ড্রোন পাঠাচ্ছিল, যা রক্ষা করা ছিল অবিশ্বাস্যরকম কঠিন।’
ব্যাপক অনুসন্ধানের স্বার্থে রয়টার্স মধ্যপ্রাচ্যের অবকাঠামোগত হামলা এবং এর প্রত্যক্ষ ফলাফল সম্পর্কে সরাসরি জানেন বা জড়িত আছেন—এমন অন্তত ৩৬ জন বিশেষজ্ঞ ও প্রত্যক্ষদর্শীর দীর্ঘ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছে। সংগৃহীত হামলার অসংখ্য ছবি ও স্যাটেলাইট ভিডিও ফুটেজ নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। রয়টার্সের সংকলিত পরিসংখ্যান ও হিসাবে দেখা গেছে, হামলার পর পর সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোর প্রচারিত অন্তত ৩৪টি সরকারি বিবৃতিতে ক্ষয়ক্ষতির আনুমানিক কারণ হিসেবে আকাশে প্রতিহত করা ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের আকাশ থেকে খসে পড়া ধ্বংসাবশেষকে দায়ী করা হয়েছে।
রয়টার্সের এই অনুসন্ধানের বিষয়ে বিস্তারিত লিখিত প্রশ্নাবলি জমা দেওয়া হলে তার জবাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে, ‘ইতিহাস ও অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত যে যেকোনো বড় সংঘাতের পর সঠিক প্রস্তুতি ও ধৈর্যের সাথে আবার ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব।’ দেশটির বিজ্ঞাপ্তিতে আরো গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়, সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপকতর সংঘাত ও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ঝুঁকি পুরোপুরি এড়াতে অতি দ্রুত উত্তেজনা কমানোর নতুন ও কার্যকরী কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। আবার কিছু সরঞ্জামের গুরুত্ব বোঝার জন্য তেল পরিশোধন, পারমাণবিক প্রযুক্তি কিংবা ধাতু গলানোর মতো বিশেষায়িত বিষয়ে জ্ঞান প্রয়োজন। তাঁর ভাষায়, ‘এটি মস্তিষ্ক ও হৃদয়ে আঘাতের মতো।’।
তা সত্ত্বেও, উপসাগরীয় অঞ্চলের অধিকাংশ দেশই সরাসরি হামলার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে তথ্য অত্যন্ত সীমিত ও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত রাখছে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার, কুয়েত এবং সৌদি আরবের মতো রাষ্ট্রগুলো তাদের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে তথ্যের অবাধ প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক তেলবিষয়ক স্বাধীন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘ফরেন রিপোর্টস’-এর প্রেসিডেন্ট ম্যাথিউ রিড মন্তব্য করে বলেন, ‘উপসাগরীয় দেশগুলো এখন তাদের অবকাঠামোগত সংবেদনশীল ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন ও উপাত্তকে এমন একটি মাত্রায় বিবেচনা করছে, যেন তা চূড়ান্ত পর্যায়ের রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ গোপন তথ্য।’
কেবল স্থানীয় দেশের অবকাঠামোই নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলও নিজেদের কৌশলগত সামরিক ঘাঁটি এবং সেনা স্থাপনাগুলোর প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি সংক্রান্ত সার্বিক তথ্য প্রকাশে কঠোর বিধিনিষেধ এবং গোপনীয়তা বজায় রাখছে। তবে বিভিন্ন দেশের সরকার এবং আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমের সুনির্দিষ্ট প্রতিবেদনে এ বিষয়ে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য ইতিমধ্যে জনসমক্ষে প্রকাশ পেয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে রয়টার্স। তথ্য প্রকাশে এই বিধিনিষেধ এবং সেন্সরশিপ নিয়ে প্রশ্নের একমাত্র আনুষ্ঠানিক জবাব দিয়েছে বাহরাইন সরকার। মানামার সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের জননিরাপত্তা শতভাগ নিশ্চিত করা এবং অপ্রয়োজনীয় সামাজিক আতঙ্ক রোধ করতেই নির্দিষ্ট কিছু সংবেদনশীল সামরিক বা বেসামরিক তথ্যে বিধিনিষেধ আরোপ আবশ্যক ছিল।
উপসাগরীয় অঞ্চলের সাধারণ অর্থনৈতিক অবকাঠামোয় ব্যাপক তাণ্ডব চালানোর পাশাপাশি ইরান সেখানে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনাতেও অত্যন্ত নিখুঁতভাবে আঘাত হেনেছে। রয়টার্সের অনুসন্ধানের প্রাপ্ত ফলাফল এবং সংগৃহীত ছবি বিস্তারিত পর্যালোচনা করেছেন সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক শিল্প খাতের ১১ জন অত্যন্ত অভিজ্ঞ ব্যক্তি, সাবেক মার্কিন সামরিক বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তা এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। একের পর এক ধ্বংসাত্মক হামলার মুখে পড়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে এবং কূটনৈতিকভাবে এমন একটি টেকসই শান্তিচুক্তির জোর দাবি বা আহ্বান জানিয়েছেন, যেখানে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে আনার বাধ্যবাধকতা থাকবে।
হামলার মাধ্যমে জ্বালানি খাতে কী পরিমাণ ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলা হয়েছে, তার অন্যতম বড় প্রমাণ মেলে গত ১০ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের কৌশলগত ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ পাইপলাইনে হামলার ঘটনায়। এই মারাত্মক আক্রমণের ফলে একযোগে পাইপলাইনের সাহায্যে অপরিশোধিত তেলের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। মূলত হরমুজ প্রণালিকে সম্পূর্ণ বাইপাস বা এড়িয়ে লোহিত সাগরের কৌশলগত বন্দরে তেল পরিবহনের জন্য সৌদি আরব এই বিশেষ দীর্ঘ পাইপলাইনটি ব্যবহার করে আসছিল, যা বন্ধ হওয়া বৈশ্বিক তেল বাজারে নতুন ধাক্কা দেয়। ফুজাইরা বন্দরে প্রথম হামলার খবর জানানো হয় ৩ মার্চ। দুই দিন পরও উপগ্রহচিত্রে তেলের ট্যাংকগুলোতে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। ৯ মার্চ দ্বিতীয় হামলার খবর জানানো হয়। ১৪, ১৬ ও ১৭ মার্চ ফুজাইরা বন্দরে আরও হামলা হয়। যুদ্ধের প্রভাবে মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের ভবিষ্যৎ সরবরাহমূল্য ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০ ডলার বা তারও বেশি হয়ে যায়।
সৌদি পাইপলাইনের চেয়েও বিশ্ববাজারে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে এনেছে কাতারের বিখ্যাত ‘রাস লাফান’ এলএনজি প্রক্রিয়াজাতকরণ স্থাপনায় ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের আক্রমণ। এর ফলে বিশ্বের মোট উৎপাদিত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির বড় অংশ সরবরাহ এক রাতে থমকে যায়। গত মার্চ মাসে রয়টার্সকে দেওয়া এক বিশেষ এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে কাতারএনার্জির শীর্ষ নির্বাহী সাদ আল-কাবি খোলাসা করে বলেছিলেন, ইরানের মাত্র দুটি সুনির্দিষ্ট হামলায় তাদের গ্যাস উৎপাদন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল।
হুথিদের প্রত্যক্ষ দায়ী করা একটি ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলায় রিয়াদস্থ সৌদি আরবের ঐতিহ্যবাহী কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অন্তত ১২ জন সাধারণ মানুষ বা যাত্রী নিহত হন, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। বিশ্বখ্যাত একাধিক জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের মতে, ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত তাদের এক যৌথ বিবৃতির তথ্য অনুযায়ী তারা এখনও ধ্বংস হয়ে যাওয়া ‘আঞ্চলিক সম্পদ পুনরুদ্ধারের জটিল কাজ অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাচ্ছে’।
আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদদের মতে, ইরানের এই তাণ্ডবে মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত চারটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত প্রধান স্থাপনা শতভাগ পূর্বের জায়গায় পুনরুদ্ধার বা সচল করতে আনুমানিক এক বছর বা তার চেয়েও দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল তাওয়েলা বিশ্বমানের গলনাগারে সরাসরি ইরানের হামলায় অ্যালুমিনিয়াম কারখানার মোট ১ হাজার ২৬২টি ভারী উৎপাদন সেল বা ইউনিটের যাবতীয় স্বাভাবিক কার্যক্রম মুহূর্তের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ওই অ্যালুমিনিয়াম কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি সংঘাতপূর্ব স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে অন্তর্বর্তীকালীন ২০ ২৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হতে পারে। কোথাও মেরামতে কয়েক মাস লাগছে, কোথাও স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির (এডিএনওসি) প্রভাবশালী প্রধান নির্বাহী এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের শিল্প ও উন্নত প্রযুক্তি বিষয়কমন্ত্রী সরাসরি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছেন, ‘প্রতিপক্ষরা কেবল আমাদের ফিজিক্যাল অবকাঠামোতেই আঘাত হানছে না, বরং তাদের এই অব্যাহত হামলার প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে আমাদের সার্বিক জীবনযাত্রা, জাতীয় স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর স্থায়ী আঘাত হানা।’ যদিও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অনুসন্ধানের বিষয়ে কাতার, সৌদি আরব, কুয়েত ও ইরাক সরকার কিংবা আবুধাবির এডিএনওসি কর্তৃপক্ষ রয়টার্সের আনুষ্ঠানিক মন্তব্য চাওয়ার অনুরোধে শেষ পর্যন্ত সরাসরি কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি।