ভারতে একটি বিশাল সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নিশ্চিত করতে সে দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের ২৬ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার ঘুষ দেওয়া এবং মার্কিন বিনিয়োগকারীদের মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার অভিযোগে অভিযুক্ত ভারতীয় ধনকুবের গৌতম আদানির বিরুদ্ধে আনা সব ফৌজদারি জালিয়াতির মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। সোমবার (১৮ মে) মার্কিন বিচার বিভাগ (ডিওজে) নিউইয়র্কের ইস্টার্ন ডিস্ট্রিক্ট আদালতের বিচারক নিকোলাস গারাউফিসের কাছে মামলাটি স্থায়ীভাবে খারিজের জন্য একটি সংক্ষিপ্ত চিঠি পাঠিয়েছে। মার্কিন বিচার বিভাগ তাদের চিঠিতে উল্লেখ করেছে যে তারা মামলাটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করেছে এবং তাদের প্রসিকিউটোরিয়াল বিবেচনার ভিত্তিতে এই ব্যক্তিগত আসামিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগের পেছনে আর কোনো অতিরিক্ত সম্পদ বা সময় ব্যয় না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এই প্রত্যাহার প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ কার্যকর হতে এখনো আদালতের চূড়ান্ত আইনি অনুমোদনের প্রয়োজন রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আদানির পক্ষ থেকে ১০ বিলিয়ন বা ১ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের একটি বিশাল বিনিয়োগের আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতির পরপরই মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে মামলাটি ড্রপ বা প্রত্যাহারের এই নাটকীয় পদক্ষেপ নেওয়া হলো। মূলত সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের সময় এই মামলাটি প্রথম দায়ের করা হয়েছিল, যেখানে অভিযোগ করা হয়েছিল যে আদানি গ্রিন এনার্জি ভারতের সবচেয়ে বড় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের চুক্তিটি হাতিয়ে নিতে সরকারি কর্মকর্তাদের বিশাল অংকের ঘুষ দিয়েছে এবং মার্কিন ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে মূলধন তোলার সময় কোম্পানির দুর্নীতিবিরোধী নীতি নিয়ে সম্পূর্ণ মিথ্যা তথ্য দিয়েছে। প্রসিকিউটরদের দাবি ছিল, এই প্রক্রিয়ায় আদানি ও তার সহযোগীরা বাজার থেকে ৩ বিলিয়নেরও বেশি মার্কিন ডলার তহবিল সংগ্রহ করেছিলেন, যা আদানি গ্রুপ শুরু থেকেই সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে অস্বীকার করে আসছে।
ব্লুমবার্গ বিলিয়নেয়ার্স ইনডেক্স অনুযায়ী প্রায় ১০৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মালিক এবং বিশ্বের ১৭তম ধনী ব্যক্তি গৌতম আদানির আইনি কৌশলে সাম্প্রতিক বড় পরিবর্তনের পরেই সরকারের এই সুর বদল লক্ষ্য করা গেছে। গত সপ্তাহে মার্কিন গণমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল যে গৌতম আদানি তার আইনি দলে রবার্ট জে জিউফ্রা জুনিয়রকে যুক্ত করেছেন, যিনি কাকতালীয়ভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একজন ব্যক্তিগত আইনজীবী হিসেবেও কাজ করছেন।
জিউফ্রা জুনিয়র মার্কিন কর্তৃপক্ষের কাছে যুক্তি দিয়েছিলেন যে আদানি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করতে অত্যন্ত আগ্রহী, যা সেখানে প্রায় ১৫ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। তবে রয়টার্স সংবাদ সংস্থার একটি সূত্রে জানা গেছে, আদানির পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছিল যে এই ফৌজদারি মামলা চলমান থাকা অবস্থায় তার পক্ষে মার্কিন মাটিতে এই বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহারের এই প্রক্রিয়াটির ঠিক আগের দিনগুলোতে আদানি গ্রুপের বিরুদ্ধে থাকা অন্যান্য দেওয়ানি ও নিয়ন্ত্রণমূলক তদন্তগুলোও বিভিন্ন আর্থিক সমঝোতার মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তি করা হয়েছে। সোমবার মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ আদানি গ্রুপের বিরুদ্ধে ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে এলপিজি গ্যাস আমদানির একটি অভিযোগ ২৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার জরিমানার বিনিময়ে স্থায়ীভাবে নিষ্পত্তি করার ঘোষণা দিয়েছে।
আদানি গ্রুপের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তারা দুবাইভিত্তিক একটি ট্রেডারের কাছ থেকে ওমান ও ইরাকের গ্যাস ভেবে আসলে ইরানের উৎপাদিত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) কিনেছিল। এই ঘটনার পর আদানি এন্টারপ্রাইজ ভারতে এলপিজি আমদানি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে এবং মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণের জন্য কোম্পানিতে একজন প্রধান কমপ্লায়েন্স অফিসার নিয়োগ করেছে।
এর পাশাপাশি গত সপ্তাহে মার্কিন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনও (এসইসি) কথিত ঘুষের ঘটনার সাথে জড়িত দেওয়ানি মামলাটি আদানির সাথে একটি আর্থিক চুক্তির মাধ্যমে নিষ্পত্তি করেছে, যা এখন আদালতের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার এসইসির পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে আদালতের অনুমোদন সাপেক্ষে দেওয়ানি আর্থিক জরিমানা হিসেবে গৌতম আদানিকে ৬০ লাখ মার্কিন ডলার এবং তার ভাতিজা সাগর আদানিকে ১ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার জরিমানা প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হবে। মূলত এই সবকটি দেওয়ানি ও আর্থিক সমঝোতা সম্পন্ন হওয়ার পরই মার্কিন বিচার বিভাগ গৌতম আদানি, সাগর আদানি এবং বিনীত জৈনর বিরুদ্ধে থাকা মূল ফৌজদারি জালিয়াতির মামলাটি পুরোপুরি বন্ধ করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল।