প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘আমরা এখনো শেষ করিনি’ বলে সতর্ক করার পর বুধবার নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় তেহরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে ওঠে। ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে চলমান এ যুদ্ধে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।
কৌশলগত হরমুজ প্রণালী ঘিরে দুই পক্ষের লড়াইয়ের কারণে একটি প্রাথমিক সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ জলপথেও।
তেহরান থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানায়, সর্বশেষ হামলায় ‘সামরিক রসদ অবকাঠামোসহ’ বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা হয়েছে। অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, দেশটির বিভিন্ন এলাকায় হামলা হয়েছে। এর মধ্যে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকা বুশেহরও রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন টেলিগ্রামে জানায়, ‘কয়েক মিনিট আগে বিভিন্ন সংবাদসূত্র জানিয়েছে, তেহরানের পশ্চিম, পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার তৎপরতার শব্দ শোনা গেছে।’
যুদ্ধ প্রায় পাঁচ মাসে গড়িয়েছে। একই সঙ্গে নভেম্বরের আইনসভা নির্বাচনও ঘনিয়ে আসছে। এ পরিস্থিতিতে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপ বেড়েছে। যুদ্ধটি তার নিজ সমর্থকদের একটি অংশের কাছেও অজনপ্রিয়।
সমালোচকরা যুদ্ধের ব্যয়ের বিষয়টি সামনে আনছেন। মঙ্গলবার পেন্টাগন প্রধান পিট হেগসেথ বলেন, যুদ্ধের ব্যয় বেড়ে ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তিনি সেনাবাহিনীর জন্য অতিরিক্ত কয়েক বিলিয়ন ডলারের অর্থায়নের আবেদনকে সমর্থন করেন।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানায়, তারা টানা একাদশ রাতের মতো ইরানে হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক নৌ চলাচলের জন্য হুমকি সৃষ্টি করার ইরানের সক্ষমতা আরও দুর্বল করতে সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
ট্রাম্প মঙ্গলবার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ নামে পরিচিত ভূগর্ভস্থ একটি স্থাপনা। নাতাঞ্জের কাছে অবস্থিত এই ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনাটিতে ইরান ঘোষণাবহির্ভূত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র নির্মাণ করছে বলে পশ্চিমা গোয়েন্দাদের সন্দেহ।
এর জবাবে প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। খাতাম আল-আম্বিয়া সামরিক কমান্ড জানিয়েছে, এ ধরণের হামলা হলে তা ‘অঞ্চলে যুদ্ধের বিস্তার’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি জানায়, যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র ও সমর্থকদের সকল স্বার্থে হামলারও হুমকি দেওয়া হয়েছে।
এ সতর্কবার্তা এমন সময়ে এলো, যখন সৌদি আরবের বন্দর অবরোধের হুমকি দিয়েছে ইরানের মিত্র হুথিরা। এর পর যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে তেহরান তাদের হামলা আরও বিস্তৃত করেছে।
দীর্ঘ কয়েক দশকের বৈরিতার পর দুই সপ্তাহ আগে আবার যুদ্ধ শুরু হয়। ট্রাম্প বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধে যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে ইরানের ২০ বছরেরও বেশি সময় লাগবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা যদি এখনই চলে যাই, তাহলে ইরানের পুনর্গঠনে ২০ থেকে ২৫ বছর লাগবে। আমরা এখনো শেষ করিনি। আমরা এখনই চলে যাচ্ছি না।’
-হুথিদের হুমকি-
কুয়েতের সেনাবাহিনী বুধবার জানায়, ইরান থেকে ছোড়া ড্রোন হামলা প্রতিহত করতে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কাজ করছে। এটি তেহরানের সর্বশেষ পাল্টা হামলার অংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র বাহরাইন মঙ্গলবার জানায়, বারবার সাইরেন বেজে ওঠার মধ্যে তারা ইরানের হামলা প্রতিহত করেছে। কুয়েত ও জর্ডানও জানিয়েছে, তারা ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ভূপাতিত করেছে।
ইরানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা কুয়েত ও বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদের ওপর হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার স্থাপনা এবং প্রশাসনিক ভবন রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বিপ্লবী গার্ড বলেছে, ‘এই রাডার অভিযান শেষে শত্রুকে আরও শক্তিশালী ও সিদ্ধান্তমূলক ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঢেউয়ের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।’
সোমবার সৌদি আরবের বন্দর অবরোধের হুমকি কার্যকর করলে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের ‘দেখে নেওয়া হবে’ বলে জানান ট্রাম্প।
তিনি বলেন, ‘এমন কিছু ঘটলে আমরা ব্যবস্থা নেব। আমরা আগেও হুথিদের বিরুদ্ধে তা করেছি। এরপর থেকে তারা অনেকটাই নীরব।’
সৌদি আরব এ হুমকীকে ‘সন্ত্রাসী হুথি মিলিশিয়া’র হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
তবে হুথিরা কীভাবে এ অবরোধ কার্যকর করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সামুদ্রিক গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ভ্যানগার্ড টেক জানিয়েছে, সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে অপরিশোধিত তেল বোঝাই করার পর সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী একটি ট্যাংকার এবং লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী আরেকটি ট্যাংকার লোহিত সাগরে দিক পরিবর্তন করেছে।
হুথিরা যদি হুমকি বাস্তবায়ন করে, তাহলে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল রপ্তানির সৌদি আরবের সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
গত সপ্তাহে কয়েক বছর পর প্রথমবারের মতো সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা হয়। এতে ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি হুমকির মুখে পড়ে। তবে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর থেকে হুথিরা মূলত সরাসরি সংঘাতে সীমিত ভূমিকা রেখেছে।
বিপ্লবী গার্ড মঙ্গলবার জানায়, প্রণালী অতিক্রমের চেষ্টা করা দুটি ট্যাংকারে বিস্ফোরণ ঘটেছে। এতে ভয়াবহ আগুন লাগে এবং জাহাজ দুটি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
এর আগে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সংস্থা জানিয়েছিল, ওমান উপকূলে একটি ট্যাংকারে ‘অজ্ঞাত একটি ক্ষেপণাস্ত্র’ আঘাত হেনেছে।
এদিকে যুদ্ধ চললেও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই বলেছেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনির সঙ্গে বৈঠকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানান।
তার কার্যালয় জানায়, শরিফ সব পক্ষকে এমন কোনো পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান, যা অঞ্চলটিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।