কানাডার ক্যালগারি শহর থেকে কানাডিয়ান রকিজের দিকে যাত্রাপথে প্রকৃতির রূপ প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। সমতল ভূমি পার হয়ে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে এগিয়ে যাওয়ার সময় দূরের সাদা বরফে ঢাকা পাহাড়গুলো ক্রমে কাছে আসতে থাকে। এই দীর্ঘ যাত্রার গন্তব্য লেক লুইজ। ক্যামেরার লেন্সে জায়গাটির সৌন্দর্য ধারণের চেষ্টা করা হলেও বাস্তব দৃশ্যপট যেন তার চেয়েও বেশি মনোমুগ্ধকর। স্বচ্ছ পানির লেক লুইজ, ওপারে ভিক্টোরিয়া হিমবাহ এবং তার চারপাশের তুষারশুভ্র রকি পর্বতমালা যেন নিজেই একটি জীবন্ত সিনেমার সেট। ক্যালগারি শহর ছেড়ে আমাদের গাড়ি যতই কানাডিয়ান রকিজের দিকে এগোচ্ছিল, ততই বদলে যাচ্ছিল চারপাশের দৃশ্য। শহর পেছনে ফেলে সমতল পেরোনোর পর একসময় দূরে উঁকি দিতে শুরু করল পাহাড়। যত এগোচ্ছি, পাহাড়গুলো তত কাছে আসছে; কোথাও কোথাও চূড়ায় সাদা বরফ। ক্যালগারি থেকে প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার পথ।
কানাডার আলবার্টা প্রদেশের ব্যান্ফ ন্যাশনাল পার্কের অন্তর্গত এই অঞ্চলটি কেবল পর্যটকদের পছন্দের স্থানই নয়, বরং দীর্ঘ এক শতাব্দী ধরে চলচ্চিত্র জগতের সাথেও এর গভীর সংযোগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা জেসন মিলারের তথ্যমতে, মেরিলিন মনরো থেকে শুরু করে আলফ্রেড হিচককের মতো কিংবদন্তিরা এই এলাকাটির ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছেন। ফেয়ারমন্ট শাতো লেক লুইজের নথিপত্র এবং ঐতিহাসিক তথ্যাদি ঘাঁটলে দেখা যায়, পর্যটন গন্তব্যের বাইরেও এটি ছিল সিনেমার পর্দার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কখনো হ্রদের পানিতে, কখনো পর্যটকদের গায়ে এসে পড়ছে তুষারকণা। সেদিন দুপুরে ঘুরে দেখানোর সময় স্থানীয় বাসিন্দা জেসন মিলার প্রথম সূত্রটি দিলেন।
হিস্টোরিক হোটেলস ওয়ার্ল্ডওয়াইডের নথিতে ফেয়ারমন্ট শাতো লেক লুইজকে পশ্চিম কানাডার ‘হলিউড নর্থ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। ১৮৯০ সালে কানাডিয়ান প্যাসিফিক রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক কর্নেলিয়াস ভ্যান হর্ন লেক লুইজের তীরে একতলা একটি কাঠের শ্যালে বা ঘর তৈরি করেছিলেন। শুরুর দিকে পর্যটকদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৫০ জন। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে এবং ১৯১২ সাল নাগাদ বছরে পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি মানুষ এখানে সমবেত হতে শুরু করেন। বারবার সংস্কার ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে সেই ক্ষুদ্র শ্যালেটি আজকের বিশাল ফেয়ারমন্ট শাতো লেক লুইজে রূপান্তরিত হয়েছে। কিন্তু সামনে দাঁড়িয়ে মনে হলো, ক্যামেরা যেন এই সৌন্দর্যের পুরোটা ধরতে পারে না। সেই গল্পের শুরুটা অবশ্য আমার জানা ছিল না।
এই হোটেলটি পর্বতারোহণের বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। উনিশ শতকের শেষদিকে এখানে পেশাদার সুইস পর্বতারোহী গাইডদের নিয়ে আসা হয়েছিল, যারা পর্যটকদের পাহাড়ে ওঠা ও স্কিইং শেখাতেন। তবে চলচ্চিত্র ইতিহাসের প্রেক্ষিতে মেরিলিন মনরোর নাম এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৫৩ সালে ‘রিভার অব নো রিটার্ন’ সিনেমার শুটিংয়ের কাজে তিনি কানাডিয়ান রকিজে এসেছিলেন। সে সময় তিনি গোড়ালিতে চোট পেয়েছিলেন, আর ক্রাচ নিয়ে তাঁর সেই সময়ের ছবিগুলো আজ ইতিহাসের অংশ। ‘লুক’ সাময়িকীর আলোকচিত্রী জন ভ্যাশন ১৯৫৩ সালের আগস্টে ব্যান্ফে তাঁর বেশ কিছু ছবি তুলেছিলেন, যা এখনো চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে সমাদৃত।
সিনেমার কিংবদন্তি পরিচালক আলফ্রেড হিচককের স্মৃতিও জড়িয়ে আছে এই হোটেলে। যদিও তিনি সিনেমার কাজের চেয়ে ব্যক্তিগত ভ্রমণের সূত্রেই সেখানে বেশি আসতেন, তবুও তাঁর নামটি এই হোটেলের ঐতিহাসিক অতিথিদের তালিকায় অমর হয়ে আছে। নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগেও এই অঞ্চলের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। ১৯২৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত আর্নস্ট লুবিচের ছবি ‘ইটারনাল লাভ’-এর দৃশ্যধারণ হয়েছিল এখানে। জন ব্যারিমোর ও ক্যামিলা হর্ন অভিনীত এই ছবির পটভূমি ছিল সুইস আল্পস, কিন্তু পর্দায় সেই আবহ তৈরির জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল কানাডার রকিজকে।
কানাডার রকিজ পর্বতমালা শুধু হলিউড নয়, বরং বলিউডের নির্মাতাদেরও পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে। ২০০৩ সালে রাকেশ রোশন পরিচালিত ‘কোই…মিল গয়া’ সিনেমার শুটিং হয়েছিল এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। শিশু-অভিনেতা অনুজ পণ্ডিত শর্মা পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, সিনেমার পুরো টিম প্রায় এক মাস কানাডায় অবস্থান করেছিল। সিনেমাটির ‘হায়লা হায়লা হুয়া হুয়া’ গানের দৃশ্যে হৃতিক রোশন ও প্রীতি জিনতার পেছনে লেক লুইজের পাহাড় ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ফুটে উঠেছিল।
বলিউড ও কানাডার এই সম্পর্কের প্রভাব দেখা যায় আরও বেশ কিছু সিনেমায়। ২০০১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত অনুভব সিনহা পরিচালিত ‘তুম বিন’ ছবির বড় একটি অংশের শুটিং হয়েছিল ক্যালগারিতে। পরবর্তীকালে ২০০৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘হামকো দিওয়ানা কার গায়ে’ সিনেমার শুটিংয়ের জন্য ক্যালগারি, ড্রামহেলার ও এডমন্টন শহরকে বেছে নেওয়া হয়। অক্ষয় কুমার ও ক্যাটরিনা কাইফ অভিনীত এই সিনেমার দৃশ্যগুলোতেও কানাডিয়ান রকিজের প্রাকৃতিক দৃশ্যের ব্যবহার ছিল উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ২০০৯ সালে অক্ষয় কুমারের অভিনীত ‘এইট বাই টেন তাসভির’ সিনেমার শুটিংয়ের স্থান হিসেবে ক্যালগারি ব্যবহৃত হয়েছিল।
কেন নির্মাতারা এই অঞ্চলকে বারবার বেছে নেন, তা কিছুটা পর্যবেক্ষণ করলেই বোঝা যায়। অল্প দূরত্বেই হ্রদ, হিমবাহ, বরফে ঢাকা পাহাড়, ঘন বন এবং বিস্তীর্ণ উপত্যকার মতো বৈচিত্র্যময় দৃশ্যের সমাহার এখানে পাওয়া যায়। কম্পিউটারের গ্রাফিক্স বা ভিএফএক্সের এই যুগেও যেখানে বাস্তব লোকেশন খুঁজে পাওয়া দুরূহ, সেখানে প্রকৃতির এমন বিশাল ক্যানভাস নির্মাতাদের বাড়তি সুবিধা দেয়। এভাবে দশকের পর দশক ধরে লেক লুইজ ও এর চারপাশের প্রকৃতি সিনেমার গল্প তৈরির কারখানায় এক অন্যতম প্রধান সেটে পরিণত হয়েছে।