২০১৪ সালে হুতি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানা এবং বন্দরনগরী হোদাইদা দখল করে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকেই ইয়েমেন দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে। ২০১৫ সালে ইয়েমেন সরকারকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং ইরানের প্রভাব মোকাবিলায় সৌদি আরব সরাসরি হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেয়। ২০২২ সালের জাতিসংঘের যুদ্ধবিরতিতে সংঘাত কিছুটা কমলেও থেমে থেমে লড়াই অব্যাহত ছিল। তবে গত সপ্তাহ থেকে লোহিত সাগরের উপকূলীয় অঞ্চলে হুতিদের জোরালো হামলায় নতুন করে তীব্র সংঘাত শুরু হয়েছে।
ইয়েমেনের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি চরম অনিশ্চয়তার দিকে মোড় নিয়েছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মোখা বন্দর এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির উত্তরের হানিশ ও মায়ুন দ্বীপপুঞ্জ এখন হুতিদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। সামরিক সূত্রের তথ্যমতে, হুতিদের এই অগ্রগতির পেছনে ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সরাসরি নির্দেশনা রয়েছে। এদিকে, সৌদি-সমর্থিত বাহিনী লোহিত সাগরের উপকূল ধরে দক্ষিণে ধুবাবের দিকে সরে যাচ্ছে। বাব আল-মান্দেবের কাছে ধুবাব ও পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ প্রণালিটির ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হুতি মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি জানিয়েছেন, বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে বাধা না দিলেও সৌদি আরবের বাণিজ্যিক ও জ্বালানিবাহী জাহাজগুলোকে আটকে দেওয়া হবে। ইয়েমেনের ওপর সৌদি ব্লকেড না তোলা পর্যন্ত লোহিত সাগরে সৌদি নৌ-চলাচল বন্ধ রাখার হুমকি দিয়েছে তারা। পশ্চিম উপকূল ও কৌশলগত দ্বীপপুঞ্জ হুতিদের হাতে চলে যাওয়ায় তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের আওতা এখন ভারত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত, যা বৈশ্বিক শিপিং রুটের জন্য বড় হুমকি।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হুতিদের ওপর হামলা চালানোর জন্য চাপ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আপাতত সরাসরি সামরিক অভিযানে যাওয়ার পরিকল্পনা ওয়াশিংটনের নেই। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান-সমর্থিত হুতিদের এই বিজয় মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তি কমানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তান সৌদি আরবের পক্ষ থেকে ইরানকে কঠোর বার্তা দিয়েছে যেন তারা হুতিদের লাগাম টেনে ধরে। তবে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হুতি হামলার জবাবে কোনো সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে আলোচনা হয়নি।
ইয়েমেন সরকারের সামরিক বাহিনীর সদস্য ৩ লাখ হলেও, আড়াই লাখ সদস্যের হুতি বাহিনীর সামনে তারা টিকতে পারেনি। দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি বলেন, বর্তমান হুতি বাহিনী এক দশক আগের তুলনায় অনেক বেশি আধুনিক ও উন্নত। কয়েক বছর ধরে ইরান থেকে পাওয়া ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের সাহায্যে তারা শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা গড়ে তুলেছে।
ইয়েমেনে যুক্তরাজ্যের সাবেক রাষ্ট্রদূত নিকোলাস হপটন জানান, ইয়েমেন সরকার এখন টেকসই সমাধানের পথ খুঁজছে। তবে মূল নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করছে রিয়াদ। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার ইতোমধ্যে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি বৈঠকের জন্য সৌদি আরবে অবস্থান করছেন। যুক্তরাষ্ট্র এখন এক জটিল কূটনৈতিক ও সামরিক দোটানায় আছে; কারণ সরাসরি অভিযানে জড়ালে তা ইরানের বিরুদ্ধে প্রক্সি যুদ্ধকে উসকে দিতে পারে। অন্যদিকে, হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি হামলায় অংশ নিলে তারা মার্কিন ও পশ্চিমা স্বার্থে আঘাত হানার হুমকি দিয়ে রেখেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইরানের সমর্থনে এই সশস্ত্র গোষ্ঠী তখন থেকেই এডেনভিত্তিক ইয়েমেন সরকারের পক্ষে থাকা সৌদি নেতৃত্বাধীন উপসাগরীয় জোটের বিরুদ্ধে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এরপরই দৃশ্যপট দ্রুত বদলে যেতে শুরু করেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইয়েমেনের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এক চরম অনিশ্চয়তা ও নতুন সামরিক ভূ-রাজনৈতিক সংকটের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিশ্লেষকদের মতে, ইরান-সমর্থিত হুতিদের সাম্প্রতিক বিজয়গুলো গত ফেব্রুয়ারিতে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক আলম সালেহ আলজাজিরাকে বলেন, ‘ইরান এখন একাধারে হরমুজ প্রণালি এবং এর বাইরে অন্যান্য সমুদ্রপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এটি ওয়াশিংটনের ওপরও চাপ বাড়াচ্ছে।’। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: শেষ পর্যন্ত রিয়াদ পুনরায় আলোচনার টেবিলে ফিরে আসবে, নাকি যুদ্ধের তীব্রতা বাড়াবে—তার ওপরই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের এই কৌশলগত প্রবেশদ্বারের ভবিষ্যত।’। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইয়েমেনে সামনের কয়েকদিনে কী হতে যাচ্ছে।